‘বিশ্বকাপ শেষ, মনটা কেন এত ফাঁকা?’ ‘পোস্ট-ইভেন্ট ব্লুজ’ কাটিয়ে ওঠার ১০টি সহজ উপায়



খবর:

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাতের ঘুম, দিনের রুটিন আর অবসর সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফুটবল। মাঝরাতে অ্যালার্ম দিয়ে ম্যাচ দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে ওয়াচ পার্টি, প্রিয় দলের জয়ে উচ্ছ্বাস, হারে মন খারাপ সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন জীবনেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কমে আসে ফুটবলের আলোচনা, আর প্রতিদিনের সেই নির্দিষ্ট ম্যাচের সময়টা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে যায়। তখন অনেকের মনেই তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা। 

মনোবিজ্ঞানে এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘পোস্ট-ইভেন্ট ব্লুজ’। দীর্ঘদিন ধরে কোনো আনন্দঘন আয়োজনের সঙ্গে আবেগের বন্ধন তৈরি হলে সেটি শেষ হওয়ার পর এমন অনুভূতি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সুখবর হলো, এটি সাধারণত সাময়িক। কয়েকটি সহজ অভ্যাসই আপনাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।… (https://www.haal.fashion/lifestyle/well-being/3bt462xg09)

মন্তব্য:

পোস্ট ইভেন্ট ব্লুজ বা ডোপামিন ক্র্যাশে মানুষের হতাশাগ্রস্থ হয়ে যাওয়া শুধুমাত্র একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; বরং এটা বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণকারী ‘ডোপামিন নিঃসরণ ও বাণিজ্যিক ফাঁদ’ এর আউটকাম। 

রোমান সাম্রাজ্যে একটি প্রবাদ ছিল, ‘জনগণকে রুটি ও সার্কাস দাও, তারা কখনো বিদ্রোহ করবে না’। তথাকথিত আধুনিক বিশ্বে বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টগুলো সেই সার্কাস হিসেবে কাজ করে। খেলার শেষ দশ মিনিটের টানটান উত্তেজনা, প্রিয় দলের জয় কিংবা গোল হওয়ার মুহূর্তগুলো মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দেয়। যার কারণে মানুষ দেশের অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, রাজনৈতিক সংকট কিংবা নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতাগুলো ভুলে এমন এক ভার্চুয়াল তৃপ্তি পায়, যা তাকে কর্পোরেট কিংবা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে বাধা দেয়। কিন্তু বিশ্বকাপের নেশায় বুঁদ হয়ে থেকে তো আর জীবন চলে না! তখন এটা শেষ হওয়া মাত্রই মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যা ও অপ্রাপ্তিগুলো সামনে চলে আসে। যেগুলো প্রায় সময়ই মানুষ সমাধান করতে পারে না। তখন তাদের ভিতরে হতাশাগ্রস্থতা কাজ করে।

আর ঠিক তখনই পুঁজিবাদী সমাজ ও মিডিয়া একে ‘পোস্ট ইভেন্ট ব্লুজ’ নাম দিয়ে হতাশাগ্রস্ত মানুষকে ডোপামিন নিঃসরণের নতুন কোন ফাঁদে ফেলার পঁয়তারা করে। কারণ ডোপামিনের পরোক্ষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মূল্য যে ট্রিলিয়ন ডলারের সমান! অর্থাৎ পুঁজিবাদ প্রথমে মানুষকে অতিরিক্ত খাটিয়ে এবং সস্তা বিনোদনের আসক্তি দিয়ে বিষন্ন ও ক্লান্ত বানিয়ে ফেলে। মানুষকে পারকিনসন্স, এডিএইচডি রোগে ভোগায়। তারপর সেই রোগ দূর করার জন্য আবার ওষুধ, থেরাপি, দামি গেজেট, ট্যুরিজম, পর্ন ও মুভি ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির মাধ্যমে নতুন নতুন পণ্য বিক্রি করে। এভাবে ক্রমাগত অবাধ ডোপামিনের নিঃসরণ ও পন্য কেনার পুঁজিবাদী ফাঁদে পড়ে মানুষ হারায় তার জীবনের মূল্যবান সময়, স্বাস্থ্য, সম্পদসহ সবকিছু।

তাই এসব ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে হলে মানুষকে সর্বপ্রথম পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে বের করে এমন শাসন ব্যবস্থায় পরিচালনা করতে হবে, যেখানে পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রিই শেষ কথা নয়। যেখানে ক্ষতিকর, অশ্লীল কিংবা মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে এমন পণ্যের প্রমোশন ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনগুলি নিষিদ্ধ থাকবে। পণ্য উৎপাদন সর্বপ্রথম গুরুত্ব পাবে সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, তারপর বিলাসবহুল পণ্য উৎপাদন। শিক্ষা ব্যবস্থায় যেখানে প্রতিটি শিশুকেই শৈশব থেকে শেখানো হবে তার জীবনের উদ্দেশ্য, সময়ের মূল্য কিংবা পরকালে আল্লাহ্’র (ﷻ) নিকট জবাবদিহিতা। সেই সাথে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি কিংবা বাস্তব জ্ঞানগুলো শেখানো হবে, যেন তা জনমানুষের কল্যাণে লাগে। ইনফিনিট স্ক্রলিং, শর্ট ভিডিওর ফাঁদে মানুষকে স্ক্রীনে আটকে রেখে তাদের মানসিক বিকৃতি ঘটানোর প্রচেষ্টাগুলোকে আইনী কাঠামোর দ্বারা নজরদারিতে রেখে মিডিয়া এবং বিনোদন মাধ্যমগুলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যেন মানুষের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধের চেতনা জাগ্রত হয়। মানুষ এখানে একদিকে খেলা দেখা, ভিডিও দেখা, পরিবারের ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে সময় কাটানোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ডোপামিন নিঃসরণে আনন্দ পাবে, আবার সময়, সম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে আল্লাহ্’র (ﷻ) প্রতি জবাবদিহিতার দৃষ্টিভঙ্গিগুলো তার ভিতরে সর্বদা দায়িত্ববোধের চেতনাকে জাগ্রত রাখবে। ফলে পোস্ট ইভেন্ট ব্লুজের মতো হতাশাগ্রস্থতা থেকে জীবন মুক্ত হয়ে পরকালমুখী হবে এবং স্বস্তিদায়ক হবে। আল্লাহ্’ (ﷻ) বলেছেন, “…জেনে রাখ, আল্লাহ’র স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়” [সূরা আর-রাদ : ২৮]

    -    মোঃ জহিরুল ইসলাম


Previous Post Next Post

Popular Items