খবরঃ
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র সচক্ষে দেখলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বুধবার (৪ মার্চ) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে তিনি ওই কার্যালয়ে প্রবেশ করে দেখেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাই তখন পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন মন্ত্রী এভাবে অতর্কিত পরিদর্শনে আসায় কার্যালয় জুড়ে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। প্রতিমন্ত্রী প্রায় আধা ঘণ্টা সময় অফিসের বারান্দায় বসে কর্মকর্তাদের জন্য অপেক্ষা করেন, যা স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও উপস্থিত সবার নজর কেড়েছে।… (https://www.ittefaq.com.bd/777754/সারপ্রাইজ-ভিজিটে-ভূমি-প্রতিমন্ত্রী-অফিসে-নেই-কোনো)
মন্তব্যঃ
দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে প্রতিমন্ত্রী সাহেবের ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ নামক এই চটকদার কর্মসূচিতে হয়তো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছুদিন সতর্ক হবে, সাময়িকভাবে দুর্নীতি কিছুটা হয়তো কমবে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার তারা আবার আগের অবস্থায় ফেরত আসবে। বিশেষত এই আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর গোড়া যেখানে সেক্যুলার ব্রিটিশ উপনিবেশ, যেটি স্রষ্টা বিবর্জিত হওয়ায়, তাক্বওয়া বা স্রষ্টার আনুগত্যভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘ভয় ভিত্তিক জবাবদিহিতা’ বা ‘fear based accountability’ কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেখানে ‘প্রেডিক্টেবল’ মানুষ, তাকওয়াবান বা পিওর মানুষ থেকে বেশি গুরুত্ব পায়। ‘প্রেডিক্টেবল’ মানুষ তাদেরকে বলা হয়, যারা নৈতিকতার বিষয়ে কোন প্রশ্ন না রেখেই নির্দিষ্ট নিয়মে কাজ করে, যত অন্যায় নির্দেশই হোক না কেন, তা নিষ্ঠার সহিত পালন করে, এবং যার আচরণ পূর্বেই অনুমান করা যায়। এই ব্যবস্থায় মনে করা হয়, ‘ব্যক্তির নৈতিকতা বা তাক্বওয়া নয়, তার role টাই গুরুত্বপূর্ণ’। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার এটাকেই আমলাতান্ত্রিকতার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু ‘প্রেডিক্টেবল’ মানুষ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোন সমাজ টিকতে পারে না। কারণ এখানে অন্যায় সহ্য করে নেওয়ার অভ্যস্থতা তৈরি হয়, ব্যাপক দুর্নীতি বিস্তার করে, অবশেষে আজকের সমাজের মত সমাজ ব্যাবস্থার অধঃপতন হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে খ্রিস্টীয় ধর্মের সাথে ইউরোপের জনগণের হাজার হাজার বছরের সুদীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে, সকল ধর্ম কিংবা স্রষ্টা থেকে আগত যেকোন নির্দেশনাকে পরিত্যাগ করে তারা ম্যাক্স ওয়েবারের মতো দার্শনিকদের উপর নির্ভর করে। আর আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা ইউরোপীয়দের উপনিবেশে পরিণত হয়ে তাদের চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক, অবাস্তব ও সমাজবিধ্বংসী নিয়মগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি এবং আজও এগুলো থেকে বের হতে পারিনি। আমরাও তাদের অনুকরণে স্রষ্টা বিবর্জিত ‘predictability over purity’ র মত অদ্ভুত নিয়ম গুলোকে প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি বানিয়ে ফেলেছি। যার ফলে আমরা উপহার হিসেবে পেয়েছি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, দায়িত্বজ্ঞানহীন, নৈতিকতা কিংবা তাকওয়া বিবর্জিত একশ বিশাল আমলা ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী। যাদের ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ এর নাটক মঞ্চস্থ করা ব্যতীত দূর্নীতি প্রতিরোধে আর কিছুই করা নাই।
যদিও আমাদের রয়েছে স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণিত আল্লাহ্’র রাসূলের (সাঃ) উত্তরসূরী খলিফা ওমর (রাঃ)-এর প্রশাসনিক কাঠামোর দৃষ্টান্তসমূহ। যেটি মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা’র নির্দেশিত খিলাফত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো। যেখানে স্রষ্টারভীতি, স্রষ্টা প্রদত্ত সিস্টেমের প্রতি আনুগত্য ও জবাবদিহিতা- এ তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল ‘আবু ওবাইদা (রাঃ)’ কিংবা ‘সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)’ এর মত অভূতপূর্ব ও অনন্য ব্যক্তিরবর্গ। তার শাসনামলে প্রশাসকদের দায়িত্ব পাওয়ার আগের চেয়ে দায়িত্ব পাওয়ার পরে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি পেলে তা ‘বায়তুল মালে’ (খিলাফত রাষ্ট্রের কোষাগার) জমা দিতে হতো। তারা প্রশাসনিক পদকে ক্ষমতা নয়, আমানত মনে করতেন, বিলাসী জীবনযাপন পরিহার করে সাধারণ জীবন-যাপন করতেন, জনগণের অধিকার রক্ষা করতেন এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় করতেন। একবার খলিফা ওমর (রাঃ) আবু উবায়দা (রাঃ) শামের (সিরিয়া অঞ্চলের) গভর্নর থাকাকালীন তাঁর বাসায় গিয়ে দেখেন, সেখানে তেমন কোনো আসবাব নেই। তখন তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘দুনিয়া তোমাকে বদলাতে পারেনি’।
- মোঃ জহিরুল ইসলাম
