চাপ দিতেই কি ঢাকায় মার্কিন কর্মকর্তা পল কাপুর?


খবর: 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর ঢাকায় পৌঁছেছেন। তার এই সফর ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশকে দুটি সামরিক চুক্তি-এসিএসএ এবং জিএসওএমআইএ জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরে রাজি করানোর প্রচেষ্টা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। (https://dailyinqilab.com/national/article/870680 )

মন্তব্য:

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের এই সফরকে কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। বিশেষ করে দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তি- GSOMIA (General Security of Military Information Agreement) এবং ACSA (Acquisition and Cross-Servicing Agreement)- দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এই সফরকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

আধুনিক পুঁজিবাদি বিশ্বব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ আর সরাসরি উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। বরং অর্থনৈতিক চুক্তি, বাণিজ্যিক নির্ভরতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বড় শক্তিগুলো ছোট রাষ্ট্রগুলোর উপর প্রভাব বিস্তার করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় economic dependency বা strategic alignment বলা হয়।

সাধারণত এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ অর্থনৈতিক। বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট শক্তির সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে সেই দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণেও বহিরাগত প্রভাব বাড়তে থাকে। পরবর্তী ধাপে নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সামরিক প্রশিক্ষণের মতো বিষয় সামনে আসে। তখন অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা- উভয় ক্ষেত্রেই নির্ভরতার একটি কাঠামো তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি এই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি আলোচিত উদাহরণ। আলোচিত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে মার্কিন কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য এবং জ্বালানি আমদানির জন্য বড় বাজার খুলে দিতে হয়েছে। বিশেষ করে LNG, Boeing aircraft এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দীর্ঘমেয়াদি আমদানি প্রতিশ্রুতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে যখন কোনো দেশ একটি নির্দিষ্ট উৎসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই উৎসের রাজনৈতিক প্রভাবও বৃদ্ধি পায়- আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে এবং সেই প্রভাব আরও গভীর হবে। GSOMIA চুক্তির মাধ্যমে সামরিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত ডেটা বিনিময়ের পথ তৈরি হয়। অন্যদিকে, ACSA চুক্তি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে জ্বালানি, সরঞ্জাম, পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধা বিনিময়ের সুযোগ দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে যৌথ সামরিক মহড়া, সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের চুক্তি এবং কখনো কখনো সামরিক উপস্থিতির পথও তৈরি করেছে।

এই ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর Indo-Pacific ভূরাজনীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বর্তমানে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং চীনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে। বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে কৌশলগত জোট ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ইতিহাস দেখায়- বড় শক্তির সমর্থনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা, বিশেষ করে Saddam Hussein কিংবা Hosni Mubarak–এর সময়কার অভিজ্ঞতা দেখায় যে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে আন্তর্জাতিক মিত্রতা কখনোই স্থায়ী নয়। যখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত অগ্রাধিকার বদলে যায়, তখন দীর্ঘদিনের মিত্রতাও মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়তে পারে।

এই বাস্তবতা মুসলিম বিশ্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। ইসলামে রাজনীতি ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; বরং উম্মাহ্‌’র অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয়াবলির দেখভাল করার একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করে এবং উম্মাহ্‌ রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে। কিন্তু খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর মুসলিম ভূখণ্ডে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা মূলত পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাজনৈতিক ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে- যেখানে ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে আলাদা করা হয়েছে। ফলে ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তা ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মুসলিম দেশগুলোর নীতিনির্ধারণ প্রায়ই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “আর কখনোই আল্লাহ্‌ মু‘মিনদের উপর কাফিরদের জন্য কর্তৃত্বের পথ রাখবেন না” (সূরা আন-নিসা ৪:১৪১)।

আজকের বিশ্বরাজনীতি মুসলিম উম্মাহ্‌’র সামনে একটি মৌলিক দায়িত্ব তুলে ধরেছে, আর তা হচ্ছে রাজনীতির প্রকৃত অর্থকে পুনরায় অনুধাবন করা। ইসলামী দৃষ্টিতে রাজনীতি মানে কেবল বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আপস করা নয়; বরং ইসলামের আকীদা থেকে উদ্ভূত চিন্তা ও বিধানের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- যে জাতি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ হারিয়ে ফেলে, সে শেষ পর্যন্ত অন্য শক্তির রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়ে। আর যে জাতি নিজের আক্বীদা ও আদর্শিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি পরিচালনা করে, সেই জাতিই আবার বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়।

    -    তন্ময় ইসলাম


Previous Post Next Post