খবর:
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে নতুন কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ (স্ল্যাব) বদল করে আয় বাড়াতে চায় সংস্থাটি। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাতে পারেন গ্রাহকদের একটি বড় অংশ। এ ছাড়া বছরে দুবার দাম সমন্বয় চায় পিডিবি। পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকের উপর বাড়তি বিলের চাপ তৈরি হতে পারে। তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা মাসে ২০০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এমন গ্রাহকেরা সাধারণত বাসায় নিয়মিত একাধিক বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টিভি চালাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। (www.prothomalo.com/amp/story/bangladesh/ao6qwy0g5t)
মন্তব্য:
বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ জনগণ, শিল্পখাত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের জ্বালানী খাতের উপর পুঁজিবাদী নীতিসমূহের প্রভাব। যদিও বিদ্যুৎ একটি মৌলিক জনসেবা, তবুও এর উৎপাদন ও সরবরাহ ক্রমশ মুনাফাকেন্দ্রিক বেসরকারি দেশী-বিদেশী কোম্পানী ও বাজারভিত্তিক নীতির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর ব্যাপক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যাদের অনেকের সঙ্গে এমন চুক্তি করা হয়েছে যেখানে “ক্যাপাসিটি চার্জ” নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, শুধু কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার জন্যই সরকারকে কোম্পানিগুলোকে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এই ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে গত ১৪ বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ ডলার গচ্চা গেছে। পাশাপাশি, ভারতের আদানির কাছ থেকেও বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয় উচ্চমূল্যে, সাথে ক্যাপাসিটি চার্জতো আছেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের অর্থ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়, আর শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে উচ্চ বিদ্যুৎ বিল ও করের মাধ্যমে।
একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতিতে “কস্ট রিকভারি” বা ব্যয় পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই আমদানি খরচ, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিনিয়োগকারীদের মুনাফা পূরণের জন্য সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে থাকে। বাস্তবে এর ফলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে মুনাফা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়, কিন্তু লোকসানের বোঝা বহন করে জনগণ। অপরদিকে, দেশের গ্যাস Chevron এর মত বিদেশি কোম্পানির কাছে তুলে দেয়া হয়েছে আর দেশের কোম্পানিগুলোকে অনুন্নত করে রেখে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে আমাদের দেশীয় কয়লার মান তুলনামূলকভাবে অনেক উন্নত হলে শুধুমাত্র ভারতকে খুশি করার জন্য বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
ইসলামী অর্থনৈতিক নীতি এক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। ইসলামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল অর্থাৎ তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি ‘গণসম্পত্তি??
হিসেবে স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তিন প্রকার জিনিসে সকল মুসলিম অংশীদার; আর তা হলো পানি, ঘাস ও আগুন।” (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)। অর্থাৎ তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদিকে প্রাইভেট সেক্টরে দেয়া যাবে না কিংবা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া যাবে না। ফলে, বিদ্যুৎ এর মত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও মৌলিক জনসেবাকে সমগ্র সমাজের যৌথ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়, কেবল মুনাফা অর্জনের উপায় হিসেবে নয়। রাষ্ট্রকে এখানে মালিক নয়, বরং জনগণের সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার দায়িত্ব হলো তেল, গ্যাস ও কয়লা আহরণ করে এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা জনগণের দোরগোড়ায় স্বল্পমূল্যে কিংবা বিনামূল্যে পৌঁছে দেয়া।
ইসলামী অর্থনীতির অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য হবে কর্পোরেট মুনাফার পরিবর্তে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। গণসম্পত্তি থেকে অর্জিত আয় স্বচ্ছভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে এবং অন্যায্য চুক্তি ও শোষণমূলক মূল্যব্যবস্থাকে স্বমূলে উৎপাটন করা হবে। সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে, গণসম্পত্তি থেকে লব্ধ আয় ব্যবহার করে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করা হবে। দেশের তেল, গ্যাস, কয়লার যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এর মাধ্যমে জনগণের কাছে সুলভে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া একমাত্র ইসলামী ব্যবস্থার (খিলাফত) মাধ্যমেই সম্ভব অন্যথায় বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ একটি লাভজনক সরকারি পণ্য হিসেবেই আমাদের কাছে বিক্রি হবে।
- মো. হাফিজুর রহমান
