খবর:
নতুন অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব বাড়াতে একের পর এক কর-ভ্যাট বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সরকার। নিত্যপণ্যে উৎসে কর বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্যাকেজ ভ্যাট এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা-মোটরসাইকেল নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাবে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। (https://www.jugantor.com/national/1101710)
মন্তব্য:
প্রতিবার বাজেট অধিবেশনের সময় আসলেই মানুষের মধ্যে পণ্যের উপর নতুন কর (ট্যাক্স) বৃদ্ধির উদ্বেগ তৈরি হয়। তাদের উদ্বেগটি যে যথার্থ, মোটর বাইক ও অটোরিকশার উপর অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব যার প্রমাণ। আমরা সবসময় প্রত্যক্ষ করি, মন্ত্রীরা বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে বাজেট ঘোষণার আগে করবৃদ্ধির প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। এবারও ব্যতিক্রম নয়, যেমন, বর্তমান তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, “আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে বিগত (আওয়ামী লীগ) সরকারের লুটপাট করা ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা পেয়েছি” (একাত্তর টিভি)। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে” (বাংলাদেশ প্রতিদিন)।
দেশে বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়, রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, জনগণের উপর নতুন-নতুন ট্যাক্সের বোঝা আরোপ করা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশের মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৩%+) ঋণ করা অর্থের মাধ্যমে সংকুলান করা হয়। যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি আসে দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে এবং বাকিটা আসে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে। এই ঋণের সুদ পরিশোধের পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ দিন দিন ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে। আই.এম.এফ (IMF)-এর কাছ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই ঋণের কিস্তিগুলো পেতে, তাদের চাপিয়ে দেয়া জনবিরোধী শর্ত অনুযায়ী সংস্কারগুলো যেমন: কৃষি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি কমানো, আয়কর আইন ২০২৩ পাশ করা, ভ্যাটের আওতা বাড়ানো, ইত্যাদি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।
এগুলো ছাড়াও রয়েছে কতিপয় পুঁজিপতিদেরকে প্রণোদনা প্রদান, এবং আদানি ও কুইক-রেন্টালের মত লুটপাটের খাতে প্রচুর বিল পরিশোধের দায়। এর পাশাপাশি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীদের দুর্নীতিতো রয়েছেই। সুতরাং, বর্ধিত এসব খরচ মেটানোর জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনুসারী সরকারকে জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে, হয় বর্তমান করের হার বাড়াতে হয়, নতুবা কর আরোপের নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হয়। তাই, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে জনগণের কোন মুক্তি নেই।
অন্যদিকে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রদত্ত ইসলামী ব্যবস্থা তথা খিলাফতে রাষ্ট্রের আয় ও ব্যয়ের খাত শারী’আহ্ কর্তৃক নির্ধারিত। শাসক ও অর্থনীতিবিদদের মনগড়া উপায়ে নতুন-নতুন আয়ের কিংবা ব্যয়ের খাত খুঁজে বের করার কোন এখতিয়ার নেই। অর্থবিভাগ বাইতুল মালের স্থায়ী রাজস্বগুলো হচ্ছে: ফায় (যুদ্ধলব্ধ মাল), জিযিয়া, খারাজ, রিকাজের (ভূগর্ভস্থ সম্পদ) এক পঞ্চমাংশ এবং যাকাত। প্রয়োজন থাক বা না থাক, এ সকল উৎস থেকে নিয়মিতভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হবে। সীমান্তে আরোপিত শুল্ক রাজস্ব হিসেবে বাইতুল মালে গচ্ছিত হবে। গণ ও রাষ্ট্র মালিকানাধীন সম্পদ থেকে আয়, উত্তরাধিকারীবিহীন সম্পদ, মুরতাদের সম্পত্তি একটি রাজস্ব। তাছাড়া, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ তথা মাল আল-গুলুল বাইতুল মালে জমা হবে। জিজিয়া দিবে শুধুমাত্র উপার্জনক্ষম অমুসলিম পুরুষগণ। সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে মুসলিমগণ ঊশর প্রদান করবে। খারাজ ধার্য করা হবে জমির উর্বরতা, সেচ ব্যবস্থা, ও উৎপাদিত ফসলের উপর ভিত্তি করে। উমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় শুধুমাত্র কুফা থেকেই খারাজ এসেছিল একশ মিলিয়ন দিরহাম।
যদি শারী’আহ্ দৃষ্টিকোণ থেকে কোন নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করা উম্মাহ্’র দায়িত্ব হয়ে পড়ে এবং উক্ত কাজ করার জন্য বাইতুল মালে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে, তবে শারী’আহ্’র দৃষ্টিতে এ অর্থের যোগান দেয়ার দায়িত্ব উম্মাহ্’র উপরই বর্তাবে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের উম্মাহ্’র উপর বিশেষ কর ধার্য করার অধিকার রয়েছে, নতুবা নয়। এবং এটি শুধুমাত্র ধনীদের প্রয়োজনের চাইতে অতিরিক্ত সম্পদের উপর আরোপ করা হবে। সুতরাং, আদালত কিংবা প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ কিংবা সরকারী কোন কাজের খরচ মেটানোর জন্য রাষ্ট্র উম্মাহ্’র উপর কর ধার্য করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, “অন্যায়ভাবে কর বা শুল্ক আদায়কারী (সাহিবুল মাক্স) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না” (সুনানে আবু দাউদ)। অতএব, কেবলমাত্র খিলাফতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই মানুষকে আয়করের বোঝা থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে পারে।
- কাজী মুনতাসির
