“মাইলস্টোন ট্রাজেডির এক বছর আজ”



খবর:

এক বছর পেরিয়ে গেলেও এ ট্রাজেডির ক্ষত এখনো বহন করছেন নিহতদের স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। সেই দিনের বিভীষিকা, স্বজন হারানোর আর্তনাদ ও আহতদের জীবন বাঁচাতে নিরলস ছুটে চলা উদ্ধারকর্মীদের দৃশ্য এখনো অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। গত বছরের এ দিনে (২১ জুলাই) সংঘটিত দুর্ঘটনায় বিমানটির পাইলটসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান। এদের মধ্যে— ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক, একজন কর্মচারী ও বিমানটির পাইলট ছিলেন। (https://bonikbarta.com/bangladesh/SwfSyNEbeDnr35ys)

মন্তব্য:

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ৩৬টি প্রাণহানি নয়—এই এক বছরে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়েছে? এরপরও একই চিত্র অব্যাহত। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে—প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫টি; এতে অন্তত ৮৫ জন নিহত ও ২৬৭ জন আহত হন। একই বছরে ১০টি ট্রেন, চারটি লঞ্চ ও দুটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে হাজার হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২০২৬ সালের মার্চে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত আট বছরে শুধু পূর্বাঞ্চলেই আটটি বড় রেল দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও অন্তত ২১৮ জন আহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, নৌ ও রেল দুর্ঘটনা—প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি, সহানুভূতির বক্তব্য ও কখনো ক্ষতিপূরণ ঘোষণা হলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। অথচ দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা নয়; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস পাঠানোর পাশাপাশি আগেই ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ট্রেন দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ নির্মূল করা এবং বিমান দুর্ঘটনার পর তদন্তের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, উড্ডয়নপথ ও জরুরি প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশে এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বারবার ব্যর্থ হওয়াই প্রমাণ করে—সমস্যা শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।

এই সংকটকে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা ভাবারও সুযোগ নেই। জনগণের নিরাপত্তাকে যখন প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বাজার ও মুনাফার ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হয়, তখন তথাকথিত উন্নত দেশেও একই ধরনের বিপর্যয় ঘটে। ২০১৭ সালের যুক্তরাজ্যের গ্রেনফেল টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডে ৭২ জন নিহত হন; পরবর্তী তদন্তে ভবনের ক্ল্যাডিং, অগ্নিনিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স দুর্ঘটনাও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, কর্পোরেট চাপ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি করে। অর্থাৎ সমস্যা কেবল কোনো একটি দেশের প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; বরং এমন এক বৈশ্বিক শাসনদর্শনের সমস্যা, যেখানে মানুষের নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। সেক্যুলার ব্যবস্থায় নির্বাচন, আদালত, গণমাধ্যম ও আইন শাসকের জবাবদিহির প্রতারণামূলক মাধ্যম হলেও এগুলো মূলত শাসকের পিঠ বাচানোর কাজই করে থাকে। এর পাশাপাশি এই ব্যবস্থায় শাসককে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো আখিরাতভিত্তিক জবাবদিহি নেই। ফলে কোনো কর্মকর্তা ঘুষ নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের অনুমোদন দিলে, কোনো প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে শাস্তি এড়িয়ে গেলে, কিংবা কোনো মন্ত্রণালয় বছরের পর বছর একই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থ হলেও—শুধু পদ পরিবর্তন মানুষের হারানো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই প্রয়োজন এমন এক শাসনদর্শন, যেখানে ক্ষমতা ভোগের বিষয় নয়, বরং আমানত; আর এখানেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা মৌলিকভাবে ভিন্ন।

ইসলামে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়; এটি আল্লাহ্’র (ﷻ) পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮)। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে; শাসক জনগণের দায়িত্বশীল এবং তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহিহ মুসলিম)। এই বিশ্বাস শাসকের মধ্যে এমন তাকওয়া সৃষ্টি করে, যা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিটি সিদ্ধান্তকে আখিরাতের জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করে। তখন একটি ভবনের অনুমোদন শুধু প্রশাসনিক ফাইল নয়—মানুষের জীবনের আমানত; একটি রাস্তা শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়—নিরাপত্তার দায়িত্ব; একজন কর্মকর্তা শুধু বেতনভোগী কর্মচারী নন—তিনি জনগণের অধিকার রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবন এ দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি রাতে জনগণের অবস্থা দেখতে বের হতেন এবং এক পরিবারকে খাদ্যসংকটে দেখে নিজেই খাদ্য বহন করে নিয়ে গিয়ে তাদের জন্য রান্না করেছিলেন। যখন অন্য কাউকে দিয়ে কাজটি করানোর কথা বলা হয়, তখন তিনি নিজের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন—তার পরিবর্তে কে তার পাপের বোঝা বহন করবে? এই চেতনার মূল কথা হলো: জনগণের দুঃখ শাসকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি তার আমানত। তাই ইসলামী শাসনে শাসক জনগণের ওপর বসে থাকা ক্ষমতাবান ‘ফোরম্যান’ নন; তিনি তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক।

এই দায়িত্ববোধের কারণেই ইসলামী রাষ্ট্রে নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও শারী’আহ্ দায়িত্ব। তাই নিরাপত্তা বিধি না মেনে ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা পরিচালনা, বারবার দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক নিরাপদ না করা কিংবা কর্তৃপক্ষের জানা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো চালু রাখা—এসবকে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না; এগুলো আমানত ও দায়িত্বের ব্যর্থতা। ইসলামী শাসনব্যবস্থা তাই ব্যক্তিগত তাকওয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি—দুই স্তরে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

    -    মোঃ হাফিজুর রহমান

Previous Post Next Post