খবর:
বিশ্বের প্রায় সর্বত্র উগ্র জাতীয়তাবাদের কদর এখন। এই মতাদর্শের বড় এক উপাদান ‘অপর’কে অশান্তিতে রাখা। এটাই অনেক অঞ্চলে তার জনপ্রিয়তার জাদু। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের কবলে পড়েছে। পুশ ইন সমস্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। তবে এবার নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া মাত্র পুশ ইনের সুনামি শুরু হয়েছে বলা যায়। গত দুই সপ্তাহে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১০ জায়গা দিয়ে নানা বয়সী মানুষদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সেই ঠেলে দেওয়া নারী-পুরুষ-শিশুদের বাংলাদেশ জিরো লাইনে আটকে রাখছে। এভাবে মাইলের পর মাইল সীমান্তজুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্য এখন। (https://www.prothomalo.com/opinion/column/g19hn7jedr)
মন্তব্য:
লেখক উগ্র জাতীয়তাবাদকে তার লেখায় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এর চর্চাকারী ইউরোপে কিন্তু এটি “সমস্যা” হিসেবে নয়, বরং “সমাধান” হিসেবে এসেছিল। ১৬১৮ সালে খ্রিষ্টান ক্যাথলিক এবং প্রটেস্ট্যান্ট মধ্যকার মতবিরোধের উপর ভিত্তি করে যে ত্রিশ বছরের রক্তক্ষয়ী নৃশংস যুদ্ধ চলে, ওয়েস্টফ্যালিয়া চুক্তি ১৬৪৮ সালে সেই যুদ্ধের অবসান ঘটায়। কিন্তু অবসান ঘটে অমীমাংসিতভাবে। কারণ তারা তাদের সমস্যা দূর করতে না পেরে এই ওয়েস্টফ্যালিয়া চুক্তি দিয়ে জাতিরাষ্ট্রের সূচনা করে। কিন্তু, জাতিরাষ্ট্র একটি আবেগ-তারিত চিন্তা, যা হতে রাষ্ট্রের রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ-বিচার ব্যবস্থা কোনটাই আসেনি, ফলে রাষ্ট্রগুলো হয় পুঁজিবাদী বা সমাজতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রের মত মানবরচিত ব্যবস্থা আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বিকশিত ও বাস্তবায়িত হয়েছে। যেহেতু, জাতীয়তাবাদ মানুষের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভাষা, জাতি, ভূখন্ড বা সংস্কৃতিকে গ্রহন করেছে, তাই আমরা বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় উগ্র-জাতীয়তাবাদের উপস্থিতি দেখতে পাই। তারই প্রতিফলন ইউরোপসহ সারাবিশ্বেই অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, মুসলিম বিদ্বেষ চরমভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে UNHCR-এর হিসেবে বিশ্বে প্রায় ৪৫ লক্ষ রাষ্ট্রহীন মানুষ আছে — যাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই, এবং যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও চলাফেরার স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ ভারতের এই পুশ-ইনের পিছনের গল্পটাও তাই। দুইটা রাষ্ট্র মানবিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জাতীয়তাবাদকে রক্ষা করার জন্য নারী – শিশুসহ অসহায় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা না খাইয়ে, রোদে পুড়িয়ে, বৃষ্টিতে ভিজিয়ে শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে অবর্নণীয় কষ্ট দিচ্ছে।
ইসলামে মানুষের মৌলিক রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্বাস এবং আদর্শ — জাতি, ভাষা বা বর্ণ নয়, কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই ভিত্তিতে পরিচয়কে নিষিদ্ধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন: “যে ব্যক্তি আসাবিয়্যার (জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ) দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়; যে ব্যক্তি আসাবিয়্যার জন্য যুদ্ধ করে, সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয় এবং যে ব্যক্তি আসাবিয়্যার উপর মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়” (সুনান আবু দাউদ)। বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি (সাঃ) বলেন: “হে মানবমণ্ডলী! সাবধান, তোমাদের রব (প্রতিপালক) একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন (আদম)। জেনে রাখো, কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের (অ-আরব) এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। অনুরূপভাবে কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের, কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই—কেবলমাত্র তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ছাড়া” (মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকী)। ১৪৯২ সালে অর্থাৎ আজ থেকে শত শত বছর আগে ইহুদিদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। ইউরোপ তার নৃশংসতায় ইহুদি নিধন করছিল। সে সময় অটোমান সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ও রাণী ইসাবেলার হাত থেকে ইহুদিদের রক্ষা করে। দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ আলহামরা ডিক্রি জারি করে, অর্থাৎ ইহুদিত্ব না ছাড়লে স্পেনে আর জায়গা হবে না। সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ জাহাজ পাঠিয়ে ইহুদিদের নিয়ে আসেন, নাগরিকত্ব দেন এবং বসতি স্থাপনের জায়গা দেন। জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে মানবজাতির মুক্তির পথ নেই। তাই আজকে সময় এসেছে মুসলিমদের শুধু মুসলিমদের রক্ষার জন্যই না, বরং পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের অভিভাবক হিসেবে পুনরুজ্জীবিত হওয়া।
- জাবির জোহান
