ইজারা দেওয়া হবে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ১১ ট্রেন



খবর:

বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলে ১১টি ট্রেন দেওয়া হবে ইজারা। ট্রেনগুলো ইজারা দেওয়ার অনুমোদন চেয়ে রেল সদর দফতরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতির কারণে ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন ইজারা দেওয়া হচ্ছে। এতে ট্রেনগুলো লাভজনক অবস্থানে আসবে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। (ইজারা দেওয়া হবে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ১১ ট্রেন)

মন্তব্য:

দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, জটিলতা ইত্যাদির দোহাই দিয়ে যখন কোনো রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন মূল সমস্যাগুলো অদৃশ্য হয় না—বরং নতুন রূপে, প্রায়শই চুক্তির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গেঁড়ে বসে যায়। বেসরকারীকরণের ফল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট-কেন্দ্রিক দুর্নীতির অভিজ্ঞতা তার বড় প্রমাণ। তাছাড়া, এলএনজি আমদানী, টার্মিনাল বানানো, পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ব্রিজ-ফ্লাইওভার-এক্সপ্রেসওয়ে নির্মানকাজে, বিভিন্ন জ্বালানী ব্লককে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার চুক্তি কেন্দ্রিক দুর্নীতিকে তাই ‘মেগা দুর্নীতি’র মত বিশেষ নাম দিতে হয়েছে। এসব প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসুত্রিতা এবং ব্যয় বাড়ানো, প্রকল্প পরিবর্তন করা, এমনকি খরচ পুরোটা শেষ হওয়ার পর প্রকল্প বাতিল করার মত ঘটোনাও নিয়মিত ঘটছে। অনেক সরকারী কারখানা, ইকোনমিক জোন ইত্যাদি বেসরকারী খাতে দেয়ার দীর্ঘদিন পরও কিছুই করা হয়নি এমন উদাহরণও অসংখ্য। অর্থাৎ মূল সমস্যাকে দূর না করে ‘বেসরকারীকরণ’ বরং সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে ক্ষমতাধর ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর লুটপাটের সুযোগ করার ব্যবস্থা। রেলের ক্ষেত্রেও একই ভয়—ইজারাদার প্রতিষ্ঠান মুনাফা সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যেই পরিচালনা করবে, যার দায় শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ভাড়া বৃদ্ধি ও সেবার মান হ্রাসে গিয়ে পড়বে। 

গণপরিবহন কোনো সাধারণ পণ্য নয়—এটি লাখো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র সাশ্রয়ী মাধ্যম, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত জাতীয় স্বার্থে। এসব ক্ষেত্রে লোকসান বন্ধ করার চেয়েও অগ্রাধিকার দিতে হবে জনগণের জন্য সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করার। 

বাংলাদেশে বেসরকারিকরণের পক্ষে যে যুক্তিগুলো বারবার সামনে আসে, সেগুলো সত্যিকারের নাগরিক স্বার্থ বা সেবার মান থেকে আসে না। বাস্তবতা হলো, এই উদ্যোগগুলোর পেছনে মূল চালিকাশক্তি থাকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের শর্ত পূরণের তাড়া। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ঋণযোগ্যতার ভাবমূর্তি তৈরি হয়, আর সেই ঋণ পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে চাপানো হয় ভর্তুকি কমানো ও রাষ্ট্রীয় খাত মুনাফা-কেন্দ্রিক করে তোলার নির্দেশনা। ফলে সরকার নিজেই একে “ঋণ পরিশোধে সক্ষম প্রতিষ্ঠান” বানানোর তাড়ায় জনগণের সম্পদ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়।

দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা বা প্রশাসনিক অসামর্থ, জটিলতা ইত্যাদি হচ্ছে মুলতঃ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ‘মালিকানার স্বাধীনতা’ নীতির ফল। এই ব্যবস্থায় অতিসম্পদশালী ক্ষমতাধর গোষ্ঠী আইন, প্রতিষ্ঠান, বিচার সবকিছুর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অর্থাৎ সম্পদের মালিকানাকে নিয়ন্ত্রিত না করলে এবং এর সাথে আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও আধ্যাতিক জবাবদিহিতা যুক্ত না করতে পারলে এসব সমস্যার সামধান সম্ভব না। ইসলামের মূল স্পিরিট হলো আল্লাহ্ (ﷻ) হচ্ছেন সকল সম্পদের স্রষ্টা এবং চুড়ান্ত মালিক, মানুষ কেবল এগুলোর রক্ষনাবেক্ষনকারী ও সুবিধাভোগী। ফলে সম্পদের পূর্ণাংগ ব্যবস্থাপনা নীতি আসতে হবে সম্পদের স্রষ্ট্রার কাছ থেকে। ক্ষমতাধর ও পুঁজিপতিরা যেকোন সম্পদের যেকোন পরিমাণে মালিক হতে পারবে এই স্বাধীনতা ইসলাম দেয় না। ইসলাম সম্পদের মালিকানাকে সম্পদের প্রকৃতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট করে দেয়। ইসলাম অনুযায়ী যে সম্পদ জনগণের জীবন যাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এবং যেসব সম্পদ কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্থ হবে সেসব সম্পদের ‘প্রাইভেটাইজেশন’ নিষিদ্ধ। এইকারণে রাস্তাঘাট, নদী-সমুদ্র-জলপথ, রেলপথ ইত্যাদি এর প্রকৃতিগত কারণে ‘গণমালিকানাধীন সম্পদ’। এই ধরণের সম্পদগুলোকে লাভের অযুহাতে প্রাইভেটাইজ করা যাবে না। খলিফা জনগণের দায়িত্বশীল হিসেবে এসব ‘গণমালিকানাধীন সম্পদ’ দেখভাল করবেন, উন্নয়ন করবেন এবং জনগণের জন্য কাজে লাগাবেন।  

    -    মোহাম্মদ তালহা হোসেন

Previous Post Next Post