খবর:
বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘আজকে কানেক্টিভিটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিস্তারিত কথা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডর তৈরির প্রস্তাব এসেছে। এই ইকোনমিক করিডরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, ট্রানজেকশন বাড়ানো এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও এনহ্যান্স করা’ (https://www.prothomalo.com/bangladesh/2772kyfj04)।
মন্তব্য:
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর মূলত চীনের উচ্চাভিলাষী “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (BRI) প্রকল্পের অংশ। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য জল ও স্থলপথে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে এক অবকাঠামোগত নেটওয়ার্কে এনে বিশ্বজুড়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিরঙ্কুশ করা। তবে, চীনের এই অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য সরাসরি হুমকি। ফলে, আমেরিকা চীনের উত্থান ঠেকাতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র আকসা (ACSA) ও জিসোমিয়া (GSOMIA)-র মতো সামরিক চুক্তি এবং এআরটি (ART)-র মত অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির অংশ বানাতে চায় যা চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য একটি বড় হুমকি। তাছাড়া, চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান দুর্বলতা হলো মালাক্কা প্রণালী, যার মাধ্যমে দেশটির সিংহভাগ জ্বালানি আমদানি ও বাণিজ্য পরিবাহিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (Major Defense Cooperation Partnership) (MDCP)-এর ফলে এই জলপথে চীনের অবাধ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। এই চুক্তি সংকটকালে চীনের প্রধান বাণিজ্য পথকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা “চক পয়েন্টে” পরিণত করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে এনে দেয়। পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীতে মার্কিন নৌ-টহল চীনের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এমতাবস্থায়, চীন নিজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, এ লক্ষ্যে, বিসিআইএম (BCIM) করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” প্রকল্পের অংশ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করতে চায় ।
কিন্তু পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের লড়াইয়ে এদেশের সেক্যুলার শাসকরা জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থেই বেশি মনোযোগী থেকেছে। সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বদিচ্ছার অভাবে তারা বৈরী ও মিত্র ভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত উদ্দেশ্য নিরূপণে ব্যর্থ হয়ে দেশকে আমেরিকা ও চীনের দ্বন্দ্বে এক ঝুঁকিপূর্ণ রণক্ষেত্রে পরিণত করছে। যেমন, আমেরিকার সাথে সম্পাদিত (ART) এর ফলে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (BCIM) করিডর বাস্তবায়ন করতে গেলে বাংলাদেশ আমেরিকার রোষানলে পড়তে পারে, আবার এটি প্রত্যাখ্যান করলে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে, চীনা ঋণের ফাঁদে পড়ে পাকিস্তান তার গোয়াদর বন্দর ৪০ বছরের জন্য এবং শ্রীলঙ্কা তার হাম্বানতোতা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এমতাবস্থায়, সরকারের যদি রাজনৈতিক সদ্বিচ্ছা থাকত, তবে এই প্রস্তাবকে স্রেফ গ্রহণ বা বর্জন না করে এটিকে একটি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারতো। এর বিপরীতে মিয়ানমারে নিপীড়িত বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিরাপদ পুনর্বাসন এবং জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যাতন বন্ধের শর্ত জুড়ে দেওয়া যেত। একই সাথে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য রুখতে চীনের প্রভাবকে কাজে লাগানো যেত। কিন্তু নতজানু সেক্যুলার শাসকদের কাছ থেকে তা প্রত্যাশিত নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন ইসলামের আদর্শিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মূলভিত্তি “আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা” (আল্লাহ্’র (ﷻ) স্বার্থে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা)। এই নীতি অনুযায়ী, ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র পরাশক্তির গুটি না হয়ে তাদের ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র রুখে দেয়। জনগণের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বিষয়াদি দেখাশোনার স্বার্থে খিলাফত রাষ্ট্র চীনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। অপরদিকে, উম্মাহ্’র চরম শত্রু আমেরিকার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তাকে আটলান্টিকের উপকূলে নিজস্ব ভূখণ্ডে অবরুদ্ধ রাখবে, যাতে সে উম্মাহ্’র কোনো ক্ষতি করতে না পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্বকে যেভাবে উম্মাহ্’র স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব, তার এমন অসংখ্য বাস্তবিক উদাহরণ খিলাফত রাষ্ট্রের রয়েছে, যেমন- ১৫৮০-এর দশকে স্পেনের আগ্রাসনের মুখে যখন ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ উসমানীয় খিলাফতের সাহায্যপ্রার্থী হন, তখন খিলাফত প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ফাটলকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব শর্তে অ্যাংলো-উসমানীয় জোট গঠন করে। খিলাফত নিজের ভূখণ্ডকে ঝুঁকিমুক্ত রেখে ব্রিটিশদের ব্যবহারে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তির ঐক্য ভেঙে দেয় এবং আটলান্টিক মহাসাগরে উসমানীয় বাণিজ্যের পথ সুগম করে।
- মোঃ জাফর আহমেদ
