খবর:
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর আজ বৃহস্পতিবার তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। …সফরের প্রথম দিনে সার্জিও গোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল শুক্রবার তার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যুক্ততা এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। …কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সার্জিও গোরের সফরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বর্তমান অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান এবং ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, একই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের মূল্যায়নও এ সফরে প্রতিফলিত হতে পারে। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/0mqkspdinj)
মন্তব্য:
সার্জিও গোরের ঢাকা সফরকে ঢাকা–ওয়াশিংটন সম্পর্ক সুদৃঢ় করার সুযোগ হিসেবে দেখানো হলেও, উপনিবেশবাদী শক্তির কূটনীতিকে এতটা সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি একই সঙ্গে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত। ফলে তার সফরকে কেবল ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের চশমায় দেখলে এর আসল ভূ-রাজনীতি আড়ালে থেকে যাবে। এই অঞ্চলে মার্কিনীদের পররাষ্ট্রনীতি তথা চীনের উত্থান ঠেকানো, ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করা, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে ঘিরে থাকা রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিন প্রভাব ধরে রাখা, এবং এই অঞ্চলে পরাক্রমশালী রাষ্ট্র খিলাফতে রাশিদাহ্’র উত্থানকে ঠেকানো—এই বৃহত্তর কৌশলের মধ্যেই বাংলাদেশের অবস্থানকে দেখতে হবে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরের প্রবেশপথ এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিছক ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি কৌশলগত সম্পদ।
সার্জিও গোরের এই সফর আমাদেরকে আবারও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, আর তা হচ্ছে বাংলাদেশ কি সত্যিই স্বাধীনভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করতে পারে? বৃটিশ উপনিবেশবাদীরা একসময় সরাসরি আমাদেরকে শাসন করেছে, এবং তাদের অনুগত শাসকগোষ্ঠী ও উপনিবেশবাদী শাসনকাঠামো দিয়ে তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করেছে যাতে এখানকার সম্পদ সাইফুন করে ওখানে নেয়া যায় এবং আমরা তাদের প্রক্সি হিসেবে কাজ করি। পরবর্তীতে তথাকথিত স্বাধীনতা দিয়ে তারা বিদায় নিলেও তাদের অনুগত শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের রেখে যাওয়া শাসনব্যবস্থা তথা ধর্মনিরপেক্ষ-পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বহাল আছে। পশ্চিমা উপনিবেশবাদী এই ব্যবস্থাকে অনেকটা স্বয়ংক্রিয় সাইফুন (Syphon) ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা যায়, ফলে তারা বিদায় নিলেও তাদের রেখে যাওয়া কাঠামোর সুবিধা তারা পেতে থাকলো। এই অটোমেশন ব্যবস্থা যার নিয়ন্ত্রণে সেই তার সুবিধা ভোগ করে। কখনো ‘বৃটেন-ভারত’ আবার কখনো ‘আমেরিকা-ভারত’।
এই পরাধীনতা থেকে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনে, ইসলাম একটি ভিন্ন রাষ্ট্রদর্শন দিয়েছে – যা উপনিবেশবাদের রেখে যাওয়া সাইফুন (ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা) এর সাপ্লাই লাইনগুলো কেটে দিবে। এবং কুর’আন-সুন্নাহ্ প্রদত্ত সংবিধানের ভিত্তিতে দেশের শাসন, অর্থনীতি, সমাজ, বিচার কাঠামো পরিচালনা করবে এবং পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে, অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে ইসলামের ন্যায়ের শাসন ও বিশ্বাসকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কূটনৈতিকভাবে তুলে ধরবে। আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন, “তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে” [সূরা আলি ইমরান : ১১০]।
তবে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি মানে এই নয় যে ইসলামী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে কিংবা কূটনীতিকে প্রত্যাখ্যান করবে। বরং, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর মদিনার রাষ্ট্র এর বাস্তব উদাহরণ। তিনি (ﷺ) কুরাইশের সঙ্গে হুদায়বিয়ার সন্ধি করেছেন, বিভিন্ন শাসকের কাছে দূত পাঠিয়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করেছেন। কিন্তু এসব সম্পর্কের কোনোটিই ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা আদর্শকে অন্যের হাতে সমর্পণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। হুদায়বিয়ার সন্ধি তাই আমাদের শেখায় — কূটনীতি মানে আত্মসমর্পণ নয়, আপস মানে কর্তৃত্ব বিসর্জন নয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনা করবে, চুক্তি করবে এবং অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে; কিন্তু তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা থাকবে নিজের হাতেই। আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন, “আর আল্লাহ্ কখনোই কাফিরদের জন্য মুমিনদের উপর কর্তৃত্ব করার কোনো পথ রাখবেন না” [সূরা আন-নিসা : ১৪১]। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের কূটনীতি হবে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের কূটনীতি — কিন্তু কোনো পরাশক্তির অধীনতার কূটনীতি নয়।
- মোঃ হাফিজুর রহমান
