খবর:
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে দেশের সাত জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১০ হাজার ৮৫৪ জন। …প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। জেলাটিতে ৩১ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। সেখানে আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। চট্টগ্রামে ১৫ জনের মৃত্যু ও ১২ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। বান্দরবানে ছয় জন, রাঙ্গামাটিতে তিন জন এবং মৌলভীবাজারে এক জন মারা গেছেন। খাগড়াছড়িতে এক জন এবং বান্দরবানে দুজন আহত হয়েছেন। (ittefaq.com.bd/798517/সাত-জেলায়-বন্যায়-৫৬-জনের-মৃত্যু-আশ্রয়কেন্দ্রে-১০ )
মন্তব্য:
ভাটি অঞ্চল হিসেবে বর্ষাকালে প্লাবন, এই দেশের একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু, প্লাবন থেকে বন্যা বা জলাবদ্ধতার উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা অতীত ইতিহাসে দেখা যায় না। বরং, প্লাবন এই অঞ্চলের ভূমির উর্ভরতা বৃদ্ধি এবং ধরে রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। মুসলিম শাসকেরা এই প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণ করতেন, যার ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নতুন দুর্যোগ সৃষ্টি না করেই অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি করতো। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, দোলাইখাল প্রকল্প। ঢাকার প্রথম মুঘল সুবেদার ইসলাম খান ১৬০৮ সালে নগর রক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য খালটি খনন করান। এই খালটি ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের সাথে ঢাকাকে অতিবৃষ্টি থেকে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি এবং বর্ষায় পলি ছড়িয়ে ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় কৃষিরও অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছিল। মুসলিম শাসকদের ভূ-প্রকৃতি এবং এই ভূমির জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা করে নেয়া প্রকল্পগুলো এই অঞ্চলকে বৈশ্বয়িক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। সেই সময় বিশ্বের মোট জিডিপি ২৫% উৎপাদিত হতো ভারত উপমহাদেশে যার বড় অংশই হতো এই সুবেহ বাংলায়।
কিন্তু, উপনিবেশবাদী বৃটিশদের উন্নয়ন দর্শন ছিল মুসলিম শাসকদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলের সম্পদ লুটপাট এবং বৃটেনে তৈরি শিল্প পণ্যের বাজার সৃষ্টি, এবং উপনিবেশবাদী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা। এই আলোকে তারা বাংলার স্বাভাবিক নৌ-যোগাযাগ অবকাঠামোকে অকার্যকর করে তৈরি করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিস্তীর্ণ প্লাবিত ভূমির উপর তৈরি করা রেলপথ এই ভূখন্ডে জলাবদ্ধতা এবং বন্যার প্রাথমিক সূচনা করে। উপনিবেশবাদী বৃটিশরা বিতাড়িত হলেও সেকুলার শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে বৃটিশদের জুলুমমূলক উন্নয়ন দর্শন এই দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়। তাই উপনিবেশউত্তর সময়েও, নদী ধ্বংস, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে এমন অনেক প্রকল্প বিভিন্ন সরকার গ্রহণ করেছে।
এছাড়াও, জাপানের পুরাতন গাড়ির ড্যাম্পিং করার জন্য জাইকা (Japan International Cooperation Agency) সারাদেশব্যাপী প্রচুর বক্স কালবার্ড তৈরি করে বর্ষাকালের পানির প্রবাহ বিঘ্নিত করে জলাবদ্ধতাকে কাঠামোগত রূপ প্রদান করে। সমস্যাটিকে আরও গুরুতর করছে নব্য উপনিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক দশকের শত শত মিলিয়ন ডলার মেগা ড্রেনেজ প্রকল্পগুলো। প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হচ্ছে ঢাকা এবং চট্রগ্রামের মত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে। ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতাবিবর্জিত ঋণনির্ভর এসব প্রকল্প ঢাকা ও চট্রগ্রামের মত শহরগুলোকে স্থায়ী জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমানে সরকারও উপনিবেশবাদীদের ভ্রান্ত উন্নয়ন দর্শন থেকে বেরিয়ে আসতে পারেছে না। তারাও সামগ্রিক সমাধান না খুঁজে, বাঁধ মেরামত, নদী তীর সংরক্ষণের মত প্রকল্পগুলোর মধ্যেই নিজেদের প্রচেষ্টাকে সীমিত রাখছে। (বিস্তারিত জানতে দেখুন: বাঁধ মেরামত ও নদী তীর সংরক্ষণে জোরালো ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, বিএসএসনিউজ.নেট, ১৪ জুলাই ২০২৬)।
ইসলামের দৃষ্টিতে, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা মুসলিম শাসকদের উপর অর্পিত একটি ইসলামী দায়িত্ব, যার জন্য তাকে আইনগতভাবে দুনিয়ায় এবং পরকালে আল্লাহ্’র (ﷻ) নিকট কঠিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা হবে। তাই, সরকারের উচিত উপনিবেশবাদীদের তথাকথিত ঋণনির্ভর অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সতর্ক হওয়া এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণে জনগণের স্বার্থরক্ষাকে মূল অগ্রাধিকার দিয়ে সামগ্রিকভাবে তা পরিকল্পনা করা। । ইসমাঈল (রহ.) ... আবদুল্লাহ্ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন: “জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন…”
- মো: সিরাজুল ইসলাম
