“যেসব বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম এবারের ফিফা বিশ্বকাপে”



খবর:

মাঠে ও মাঠের বাইরে—একের পর এক বিতর্ক, আলোচনা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে এ বছরের ফিফা বিশ্বকাপ। তবে এবারের নকআউট পর্বে এই ক্ষোভ আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের তীব্রতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফিফার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়া মূলত এসব বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ‘ফুটবল বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে’—ফিফার এই স্লোগাণ কি শুধুই কথার কথা? (https://bangla.thedailystar.net/sports/sports-special/fifa-world-cup-2026/news-3943816)

মন্তব্য:

অবশেষে স্পেনের বিশ্বকাপ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ব্যাপক আলোচিত ও বিতর্কিত ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। বিতর্কিত পেনাল্টি, বিতর্কিত ফাউল থেকে কিছু দলের গোল বাতিল আবার কিছু সুবিধাভোগী দলের খেলোয়াররা স্পষ্ট ফাউল করলেও রেফারীর সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া, ট্রাম্পের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়ারের লালকার্ডের শাস্তি বাতিল, আফ্রিকার মুসলিম দলগুলোর সদস্যদের বিমানবন্দরে তল্লাশির নামে ব্যাপক হয়রানি ও ভিসা বিড়ম্বনা, ইরানের ফুটবল দলকে প্রতিটি ম্যাচের আগের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘুমাতে না দেয়া—মেক্সিকো থেকে এসে ম্যাচ খেলে ম্যাচ শেষে আবার হাজার কিলোমিটার দূরের মেক্সিকোতে ফিরে যেতে বাধ্য করা,  ট্রাম্পের ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার-২০২৬’ প্রাপ্তি এসবের কারণে সারাবিশ্বে এখন তুমুল বিতর্ক— ফিফা কি আসলেই নিরপেক্ষ, নাকি পর্দার আড়ালে চলেছে ‘মেসি ইকোনমিক্স’ ও করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ?

হাইতির জাতীয় দলের জার্সি থেকে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকে পরাজিত করার ‘ভার্টিয়েরেসের যুদ্ধ’-এর স্মৃতিচিহ্নকে ‘রাজনৈতিক উপাদান’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাদ দেয়ার হুকুম জারি করেছে ফিফা; অথচ, ইরানসহ মুসলিম দলগুলোর প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতামূলক ও বর্ণবাদি আচরনের ব্যাপারে মুখে কুলুপ এটেছে। বস্তুত: মানুষ সহজাতভাবে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করলেও বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শুধু ফিফা নয়, পশ্চিমা নিয়ন্ত্রনাধীন সকল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানই নিরপেক্ষতা কিংবা ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা প্রমানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। গাজা থেকে ইরান, সিরিয়া-ইরাক থেকে আফগানিস্তান, কাশ্মির থেকে রাখাইন কোথাও পশ্চিমারা কোন রাষ্ট্র কিংবা তথাকথিত জাতিসঙ্ঘ নিরপেক্ষতা কিংবা ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তার কোন নজির নেই। কেউ কেউ বলতে পারে যে এটাতো খেলা, একটা বিনোদনের বিষয়; এর মধ্যে রাজনীতি টেনে আনার কি প্রয়োজন? মূলত: “ফুটবল কখনোই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বিশ্বকাপ ফুটবল সব সময়ই ক্ষমতার লড়াই, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।” (পড়ুন: ফিফার রাজনীতি যেভাবে এবারের বিশ্বকাপকে বিতর্কিত করছে; প্রথম আলো)।  

ইতালীর ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি ফিফার সাথে দেনদরবার করে ১৯৩৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফুটবল ইতালিতে আয়োজন করেছিল। রেফারী ও অন্য দলগুলোর খেলোয়ারদেরকে ভয়ভীতি ও নানানভাবে প্রভাবিত করার মাধ্যমে ইতালি সেই বিশ্বকাপ জয় করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতালির সেই বিশ্বকাপ বিজয় বেনিতো মুসোলিনির জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বি উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যার মূল্য পরিশোধ করেছিল ১৯৩৫-৪৩ এর মধ্যবর্তী সময়ে ইতালি কর্তৃক ইথিওপিয়া, আলবেনিয়া ও মিসর আগ্রাসনে নিহত লাখ লাখ মুসলিম। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ছিল ফিফার এমনই আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়। অন্তত ৩০ হাজার নাগরিকের হত্যাকারী (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট) আর্জেন্টিনার সামরিক স্বৈরশাসক রাফায়েল ভিদেলার পিআর ট্রফি (PR Trophy) হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেই বিশ্বকাপকে। সেই বিশ্বকাপে খেলা শুরুর আগে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ দলের ড্রেসিংরুমে সামরিক পোশাক পরে গিয়ে হাজির হত রাফায়েল ভিদেলা এবং ফিফা ও রেফারীদেরকে ‘ম্যানেজ’ করে জয় করা সেই বিশ্বকাপে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার সশরীরে হাজির ছিল খেলাম মাঠে, যা স্বৈরশাসক রাফায়েল ভিদেলার গ্রহণযোগ্যতা উৎপাদনের (manufacture) প্রচেষ্টা হিসেবে এখনো ঘৃণাভরে স্মরণ করে থাকে সচেতন আর্জেন্টিনাবাসী।

২০২৬ সালে এসে ফিফা ঠিক একই কায়দায় গাজা ও ইরানে মুসলিম গণহত্যাকারী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দোসর ইজরাইলের ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকে বিশ্ববাসীর সামনে হালকা ও ম্লান করার PR Event হিসেবে ব্যবহার করেছে বিশ্বকাপের মঞ্চকে। গাজায় গণহত্যা ও ইরানে অন্যায় যুদ্ধ এখনো চলমান, কিন্তু পুরো বিশ্বকে মশগুল করে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপের জাঁকজমক ও উৎপাদন করা বিতর্ক দিয়ে। ট্রাম্পকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ-২০২৬’ প্রদান, তার কথায় লালকার্ডের শাস্তি বাতিল, অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকতে থাকা মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার দলবিন্যাস এবং মেসির জনপ্রিয়তা দিয়ে নেতানিয়াহু ও ইজরাইলের নরঘাতক চেহারাকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফিফা তার আসল চেহারাকে আবারো উন্মোচিত করেছে। মুসলিম তরুণদের জানা উচিত ফিফা ও এর তথাকথিত ‘চার্টার’ হল পশ্চিমা কুফর (অ)সভ্যতার রক্ষাকবচ। আর, মুসলিম হিসেবে তাদের অবস্থান হল ঠিক তার বিপরীত মেরুতে অবস্থিত বিশ্বমানবতার মুক্তির কান্ডারী ‘মুসলিম সভ্যতার’ ঘাঁটিতে।

আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন: “আর স্মরণ কর (বদরের কথা), যখন আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন যে, (শত্রুর) দুটি দলের একটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে, তখন তোমরা কামনা করছিলে যেন ‘ছোট’ দলটি তোমাদের হস্তগত হয়। কিন্তু, আল্লাহ্‌ চেয়েছিলেন, এই ওয়াদার মাধ্যমে তিনি যেন সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং কাফেরদের মূল কেটে দিতে পারেন। (ফলে তিনি তোমাদেরকে বড় দলটির উপর বিজয় প্রদান করলেন)” (সূরা আল-আনফাল : ০৭)

    -    রিসাত আহমেদ

Previous Post Next Post