ফ্যামিলি কার্ড ও প্রাসঙ্গিক বিবেচনা

 


খবরঃ

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কি একটি সুপরিকল্পিত, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, নাকি এটি মূলত নির্বাচনের আগে দেয়া একটি জনপ্রিয় কিন্তু অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি? বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিডি, ভিজিএফসহ অসংখ্য সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ চালু রয়েছে। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য এক- ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করা। এই বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ড যদি কেবল একই ধরনের নগদ বা খাদ্য সহায়তা প্রদান করে, তাহলে তা কার্যত বিদ্যমান কর্মসূচিরই পুনরাবৃত্তি হবে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, একই ধরনের সুবিধা দেয়ার জন্য নতুন করে এত বড় রাজনৈতিক প্রচারণার প্রয়োজন কি? সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তো কোনো দলীয় অনুগ্রহ নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও নাগরিক অধিকার।… (https://dailynayadiganta.com/opinions/opinion/2rnihMBKiGV7)

মন্তব্যঃ

এধরনের ওয়েলফেয়ার স্কিমগুলো, আপাতদৃষ্টিতে দৃষ্টিনন্দন হলেও পশ্চিমা বিশ্বে এই স্কিমগুলো বিভিন্ন ইন্সুরেন্স ও ট্যাক্সের আওতায় থাকে। সরকার এই স্কিমগুলো পরিচালনার জন্য বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও ইন্সুরেন্স কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকে। ফলে এসব পুঁজিবাদী কোম্পানীগুলোর আরও মোটাতাজা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এটাকে অনেকটা কুইক রেন্টাল কোম্পানীগুলোর সাথে পতিত হাসিনা সরকারের সময়কার চুক্তির সাথে তুলনা করা যায়, যেখানে সরকার জনগণের জন্য বিদ্যুৎসেবা ক্রয় করতে বিভিন্ন রেন্টাল কোম্পানীর সাথে চুক্তি করে, অতঃপর বিদ্যুৎ ক্রয় করুক বা না করুক জনগণের কাছ থেকে উচ্চহারে ট্যাক্স নিয়ে তাদেরকে বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা দিতে হয়েছে।

২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী কানাডার মোট জনসংখ্যার ৫.১% পরিবার বর্তমানে সরকার থেকে Social Assistance পায়, কিন্তু এদের মধ্যে ৯৮% এখনও দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের জন্য MedicAid এর মত হেলথ ইন্সুরেন্স প্রোগ্রাম চালু থাকলেও ২০২৪ সালে হেলথ ইন্সুরেন্স বঞ্চিত জনসংখ্যার পরিমান ছিল ২৭ মিলিয়নের বেশি (মোট জনসংখ্যার ৮%) যারা ন্যুনতম স্বাস্থ্য সেবাও পাচ্ছে না, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল ও ইন্সুরেন্স কোম্পানীগুলো উভয় হাতে লুটপাটের শিকার হচ্ছে। এছাড়া বারবার সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে থাকা নরডিক রিজিওনের দেশগুলো বিশ্বব্যাপী ওয়েলফেয়ার মডেলের দেশ হিসেবে উৎকৃষ্ট মনে করা হলেও এসব দেশের সরকারের ওয়েলফেয়ার কার্যক্রম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে কোন কাজে আসেনি। সম্প্রতি ইউরোপের বেকারত্বের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে ফিনল্যান্ডের নাম (মোট জনসংখ্যার ১০.৬%)। 

 সুতরাং, পুঁজিবাদের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত পশ্চিমা বিশ্বে এসব ওয়েল ফেয়ার স্কিমগুলো জনগণের জন্য কল্যান আনতে পারেনি। কারণ দারিদ্রতা, বৈষম্যসহ নানাবিধ অর্থনৈতিক সমস্যার জন্মদাতা খোদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিজেই- যেখানে সম্পদ ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জিভূত, রাষ্ট্রের নীতিসমূহ সেই একই গোষ্ঠীর স্বার্থে গৃহিত। তাই, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দোষকে ঢাকতে, সমাজতন্ত্র হতে ধার করা বিভিন্ন ওয়েলফেয়ার স্কিমের প্রচলন করেছিল, যদিও এই দুই আদর্শ পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখে কোন স্কিমই জনগণের জন্য কল্যান বয়ে আনতে পারবে না।

তাই, জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য পতনশীল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলের বিপরীতে খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ইসলামের বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়ন করা জরুরী। হিযবুত তাহ্‌রীর কর্তৃক কুরআন-সুন্নাহ্‌’র ভিত্তিতে প্রণীত খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১২৫ অনুযায়ী: রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার মত সকল মৌলিক চাহিদা পুরণ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য ফরজ। রাসূলূল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন, "আদম সন্তানের জন্য তিনটি জিনিসের চেয়ে বেশি কিছুতে কোনো অধিকার (বা আবশ্যকতা) নেই: বসবাসের জন্য একটি ঘর, লজ্জা নিবারণের জন্য এক টুকরো কাপড় এবং শুকনো রুটি ও পানি" (সহীহ্‌ তিরমিজি)। তাই,  রাষ্ট্রকে যেকোন মূল্যে, এমনকি প্রয়োজনে ধনীদের উপর ট্যাক্স আরোপ কিংবা ঋণ করে হলেও জনগণের এসব চাহিদা পূরণ করতে হবে। খনিজ ও জ্বালানীর মত গণমালিকানাধীন সম্পদ এবং অন্যান্য খাত হতে যে বিশাল রাজস্ব আসবে, তা হতে ব্যয়ের অগ্রাধিকার খাত হবে এসব চাহিদা পূরণ। উপরন্তু, ইসলামে নাগরিকদের আয়ের উপর (যেমন আয়কর) এবং ব্যয়ের উপর (যেমন ভ্যাট) কর আরোপ করা নিষিদ্ধ, এবং ইন্সুরেন্স নামক কুফর পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্বের স্থান নাই। এভাবে খিলাফত ব্যবস্থায় ইসলামের স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতির সুফল সমাজের সকল স্তরে পৌছাবে এবং জনগণের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধিত হবে। তাই, শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে, নবুয়তের আদলে  খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজকে আরও বেগবান করতে হবে।

    -    কাজী তাহসিন রশীদ


Previous Post Next Post