জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নাকি ‘সিসিফাস’?



খবর:

বলা হয় উন্নয়নশীল দেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রিক পুরাণের রাজা সিসিফাসের মতো। যত শ্রম, সময় আর একাগ্রতা দিয়েই সিসিফাস পাথরকে চূড়ায় ঠেলে তুলতে চেষ্টা করুন না কেন, দিনশেষে সেই পাথর আবার পাহাড় গড়িয়ে নিচে পড়ত। আর সিসিফাসের সংগ্রাম যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজেট ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী রূপক। (https://www.bonikbarta.com/bangladesh/ZAL1oWpXQgp5LlN6)

মন্তব্য:

প্রতিবেদনে যে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ঋণের চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারের প্রচেষ্টাকে ‘সিসিফাস সিনড্রোম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা যথাযথ। কিন্তু এই কারণগুলোকে যথাযথভাবে ভাষায  বললে তা হবে: এক কথায় আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক তথা পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া পুঁজিবাদী নীতি এবং কাঠামো। এই ব্যবস্থার মূলে রয়েছে ‘ট্রিকল ডাউন’বা চুইয়ে পড়া নীতি, যাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল পথ মনে করা হয়। এই ব্যবস্থায় ‘উপরে’ তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা ছাপিয়ে কৃত্রিমভাবে সম্পদ তৈরি করে এবং সাথে সুদ যোগ করে ঋণ আকারে নিচে ছাড়ে। এভাবে সম্পদ ‘অভিকর্ষ বল’-এ নিচে নেমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এতে গুটিকয়েক এলিটের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হতে থাকে।

পুঁজিবাদী কাঠামোতে ‘অভিকর্ষ বল’ যথেষ্ট না হওয়ায়, সরকারকে দমনমূলক কর ব্যবস্থা (যেমন ভ্যাট, আয়কর, আমদানি শুল্ক ইত্যাদি), এবং ঋণের উপর নির্ভর করতে হয়। যা একদিকে উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে ও টাকার প্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তার ওপর ঋণের চূড়ান্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়। ফলে মানুষের ‘অর্থনৈতিক সামর্থ’ কাঠামোগতভাবে উল্টো আরও কমতে থাকে। এর মধ্যে মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে হাজির হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি (ART), যার প্রভাবে কৃষির মতো মৌলিক খাতে বাজেট কাটছাঁট করতে হয়েছে, যাতে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত করে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো যায়। ART এর শর্ত অনুযায়ী সরকার কৃষিতে কোন ভর্তুকি দিতে পারবে না।

আমাদের ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা’র জন্যও এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দায়ী। কারণ প্রতিনিয়ত আমরা দেখি বিদেশী দূতাবাসগুলো এবং ক্ষুদ্র এলিট গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত তাদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের মন্ত্রণালয়, বিভাগসমূহ ও প্রতিষ্ঠান সমূহে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা (Negotiating power) প্রয়োগ করে। এতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের ও দেশের স্বার্থে কাজ করতে পারে না এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি প্রবণতা বাড়ে। এভাবে বিদেশী শক্তি, দেশীয় এলিট ও দুর্নীতি পরায়ণ কর্মকর্তাদের একটি ভয়াবহ নেক্সাস তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রকে অন্তহীন ফাঁদে আটকে ফেলে। এই চক্র সিসিফাসের সেই পাথর উঠানোর নিষ্ফল চেষ্টার মতোই। যা মূলত রোগ নিরাময় না করে রোগকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে।

এই কাঠামোগত দাসত্ব এবং ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো, আমাদের অর্থনীতিকে ইসলামের বণ্টনভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা। ইসলাম ‘ফিয়াট কারেন্সি’র কৃত্রিম অর্থ তৈরি ও মুদ্রাস্ফীতির জুলুমকে প্রতিরোধ করতে দ্বি-ধাতব (স্বর্ণ ও রৌপ্য) ভিত্তিক প্রকৃত মুদ্রা ব্যবস্থার পথ দেখায়, যা বৈশ্বিক পরাশক্তির আর্থিক কারসাজি ও কৃত্রিম ঋণের চাপকে গোড়া থেকে নির্মূল করে। এর বণ্টনমূলক ব্যবস্থা বিদেশী শক্তির চাপিয়ে দেওয়া আমদানিনির্ভরতার বিপরীতে দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষককে সকল পৃষ্ঠপোষকতা করে। সর্বোপরি, এটি সুশাসন, ব্যবস্থাগত জবাবদিহিতা ও বিচার ব্যবস্থার সাথে ‘আল্লাহ্‌’র নিকট জবাবদিহিতা’ যুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও এলিটদের অন্যায্য নীতি নির্ধারণী প্রভাবকে পদ্ধতিগতভাবে উপড়ে ফেলে। জনগণকে অর্থনৈতিক পরাধীনতা হতে মুক্ত করে, ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা সিসিফাসের এই অন্তহীন ঋণের বাজেট থেকে মুক্তি দেবে। পবিত্র কুরআন-এ আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “…যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে…” (সূরা হাশর : ০৭)।

    -    মোহাম্মদ তালহা হোসেন

Previous Post Next Post