বাউল শিল্পী আবুল সরকারের মুক্তি দাবী উদীচী ও চারণের

 


খবরঃ

সংগীত পরিবেশনের সময় ধর্ম অবমাননা ও কটূক্তির অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার মানিকগঞ্জের বাউলশিল্পী আবুল সরকারের মুক্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পৃথক বিবৃতিতে এই দুই সাংস্কৃতিক সংগঠন বলেছে, এই গ্রেপ্তার অন্যায়, অমানবিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন আঘাত। ধর্ম অবমাননার নামে ভিন্নমত দমনের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে, রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দেশ আজ মবের রাজত্বে আবদ্ধ উল্লেখ করে উদীচীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাউলশিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তারের ঘটনা শুধু একজন শিল্পীর স্বাধীনতাকে বন্দী করা নয়—এটি বাংলাদেশের পালাগান-বাউল ধারার দীর্ঘ ইতিহাসে এক দুঃসহ আঘাত, মানবিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে অসম্মানের এক নগ্ন প্রদর্শনী। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/2bewiuzdjo)

মন্তব্য:

মহান আল্লাহ্‌কে নিয়ে কটূক্তিকারী কথিত বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেফতারের ঘটনা নিয়ে সোচ্চার হয়েছে দেশের সেকুলার  এস্টাব্লিশমেন্ট। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাম সংগঠনগুলো মিছিল করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বাউল আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের পর মানিকগঞ্জে তার অনুসারীদের ওপর হামলাকে দেশের "ধর্মীয় ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি চরম হুমকি" হিসেবে দেখছে। সংগীতচর্চা বা বাউল সাধনার নামে ইসলামকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য প্রদানকে দেশের সেকুলার মহলের কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক চর্চা মনে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসম্মান করাকে তাদের কাছে সমস্যা মনে হয় না।

পশ্চিমা মতবাদ সেকুলারিজমের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রান্তি ও কপটতা স্বাভাবিক। মধ্যযুগের ইউরোপে কর্তৃত্ববাদী চার্চভিত্তিক যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমা চিন্তাবিদ ও জনগণের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ইউরোপ সেকুলারিজমের মতো একটি সমঝোতামূলক সমাধানে (Compromised Solution) পৌঁছেছিল। রাষ্ট্র থেকে খ্রিস্টান ধর্মীয় কর্তৃত্ব আলাদা করার ফলে পশ্চিমা দেশগুলো সাময়িক স্বাধীনতা পেয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য মানবরচিত মতবাদের মতোই সেকুলারিজমেরও বহু বৈপরীত্য, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা প্রকাশিত হতে থাকে। বিশেষত ইসলামী আকীদা, যা একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিধান দেয়, সেটিকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার যে প্রচেষ্টা পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বে করেছে, সেটার বিষময় ফলাফল আজ মুসলিমদের দেশসমূহে দৃশ্যমান হচ্ছে। একদিকে ইসলামের ভিত্তিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দৃঢ় হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা ও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর মদদপুষ্ট সেকুলার বুদ্ধিজীবী ও প্রতিষ্ঠানগুলো সেকুলারিজমের নামে ইসলামী আকীদার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করছে। সেকুলার রাষ্ট্রকাঠামো এই বিরোধের কোনো সমাধান কখনোই দিতে পারবে না। সংস্কৃতিচর্চা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমারেখা টানার দায়িত্ব যখন মানবরচিতকে বিধানকে দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেকুলার রাষ্ট্র এখানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়। ফলে সমাজে মতপ্রকাশ ও সংস্কৃতির নামে বিভেদ ও হানাহানি রয়েই যায়। 

সেকুলারিজমের এই অন্তর্গত ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য আবুল সরকারের ঘটনায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মাজার সংস্কৃতি, সুফিবাদ ইত্যাদির দোহাই দেওয়া হচ্ছে। অথচ সুফিবাদ কিংবা মাজার জিয়ারতের বিষয়টি কখনোই সেকুলারিজমের অংশ নয় এবং সুফিবাদ কখনোই ধর্ম অবমাননার সুযোগ দেয় না। প্রকৃতপক্ষে দেশের সেকুলার গোষ্ঠী তাদের ইসলামবিরোধী এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে সুফিবাদ ও মাজার সংস্কৃতির মুখোশ পরতে চায়। কেননা তাদের তথাকথিত গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সেকুলার চেহারা দেশের সাধারণ জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।

একটি সমাজে তখনই শৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় যখন সেই সমাজের প্রভাব বিস্তারকারী চিন্তা, আবেগ ও বিশ্বাসের আলোকে রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের সেকুলাররা তাদের নিজস্ব চিন্তাকে পুরো জাতির উপর চাপিয়ে দেওয়ার মতো ফ্যাসিবাদী আচরণ করে নিজেদেরকে মুক্তমনা ও গণতন্ত্রবাদী হিসেবে দেখাতে চায়। যতদিন তাদের এই ফ্যাসিবাদী আচরণ অব্যাহত থাকবে ততদিন দেশে শৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। এই সেকুলার আবর্জনা এস্টাবলিশমেন্টকে হটিয়ে দিয়ে যখন জনগণের চিন্তা, আবেগ, বিশ্বাস তথা আকাঙ্ক্ষাকে ধারণকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে, কেবল তখনই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

    -    রাশিদ হাসান মাহাদি


Previous Post Next Post