লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরী: সংস্কারক নাকি ইকোনমিক হিটম্যান?

খবরঃ

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশী ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ খাতে অভিজ্ঞ দুই বাংলাদেশী পেশাদারকে যুক্ত করে। তারা হলেন লুৎফে সিদ্দিকী ও চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। লুৎফে সিদ্দিকীকে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অন্যদিকে, আশিক চৌধুরীকে একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আনা হয়। কিন্তু এ দুজনের সক্রিয় ও আগাম উদ্যোগী ভূমিকা চোখে পড়লেও তাদের বেশকিছু কর্মতৎপরতা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকের মতে, সংস্কারের অগ্রভাগে অবস্থান করলেও এদুজনের কর্মকাণ্ডে তাদের ঘোষিত মূল কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, বন্দর ও বড় অবকাঠামো চুক্তির মতো ‘হাই-ভ্যালু ডিল’। রাষ্ট্র পুনর্গঠনে নীতিগত সংস্কার ও ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়নের বদলে তাদের আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এমন সব বিষয়ে, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তোলে। (https://bonikbarta.com/bangladesh/kijBG4KYKIx0W4SL)

মন্তব্যঃ

জন পারকিন্স-এর “Confessions of an Economic Hit Man" বইটি থেকে “ইকোনোমিক হিটম্যান” টার্মটি জনপ্রিয় হয়। লেখকের মতে, ইকোনোমিক হিটম্যান তারাই যারা উন্নত দেশের গোপন এজেন্ডার প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে গোপন চুক্তি করে বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে এই ঋণ শোধ করতে না পেরে সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের তেল, গ্যাস, খনিজ, নদী বন্দর, সমুদ্র বন্দর ইত্যাদি উন্নত দেশগুলোর হাতে সোপর্দ করে দিতে বাধ্য হয়। এছাড়াও জাতিসংঘের মত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অত্যন্ত আজ্ঞাবহ হয়ে থাকার নির্দেশও পালন করতে হয়। 

সংবাদে উল্লেখিত দুই ব্যক্তি ইকোনোমিক হিটম্যান হিসেবে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, উল্লেখিত দুই ব্যক্তির কেউই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বনির্ভর করার পদক্ষেপ না নিয়ে বহিঃশক্তির অধঃস্তন থাকার মরিয়া চেষ্টায় রত। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল ডেনমার্কের বিখ্যাত শিপিং জায়ান্ট এপি মলার-মারস্ক (A.P. Moller-Maersk)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস (APM Terminals) কে ৩০ বছরের জন্য দেয়া হয়েছে। আর্জেন্ট এলএনজি নামক এখনো কার্যকর না হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস কোম্পানির সাথেও চুক্তি সম্পন্ন। সামনে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেয়ার কথা আছে। দ্বিতীয়ত, এই চুক্তিগুলো সব হচ্ছে NDA (Non-disclosure Agreement) হিসেবে। অর্থাৎ, চুক্তির শর্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। তৃতীয়ত, আইএমএফ-এর কাছ থেকে যেন পরবর্তী লোনের কিস্তি পাওয়া যায়, সেটার জন্যেও হন্যে হয়ে কাজ করছেন উল্লেখিত দুজন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সব ঋণের ফাঁদে পড়া দেশগুলোর সাথে হুবহু মিলে যায়। যেমন ৮০’র দশকে নাইজেরিয়াতে তেল উত্তোলনের নামে বিশ্বব্যাংক লোন দেয়। পরবর্তীতে, লোন শোধ করতে না পেরে তেল সম্পদ চলে যায় শেল-শেভরনদের হাতে। ৭০ এর দশকে উন্নত অবকাঠামোর নাম করে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এর কাছ থেকে ইথিওপিয়া ঋণ নেয়। পরবর্তীতে, ঋণ শোধ করতে না পেরে দেশটির বন্দর, কৌশলগত অবস্থান সবকিছুরই একচ্ছত্র আধিপত্য পেয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ যেহেতু ইতোমধ্যেই প্রায় ১০৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণে ঋণগ্রস্ত এবং ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শেভরন ৬০ শতাংশ গ্যাস তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তাই বর্তমানে দুই ব্যক্তির উদ্দেশ্য হল আরো বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির সাথে অতি দ্রুত বাংলাদেশের চুক্তি বা দাসখতনামা লেখা হয়ে যাক। তাদের এই অত্যুৎসাহী চুক্তি করিয়ে দেয়ার প্রবণতাই তাদেরকে ইকোনোমিক হিটম্যান পরিচয় দিচ্ছে।

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের মানুষ একটা সত্যিকারের নতুন বন্দোবস্ত চেয়েছিল, যেখানে আর কোন বহিঃশক্তি রাষ্ট্রের উপর অন্যায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু শুরুতেই পরিবর্তনের আশায় উন্মুখরা এই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার পুরাতন বন্দোবস্ত ধ্বংস না করে, ঔপনিবেশিক দেশগুলোর হিটম্যানদের নানা দায়িত্বে আসাকে আটকাতে পারেনি। পারেনি এই পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে বের হতে। এই কাঠামো থেকে বের হতে হলে অবশ্যই নতুন আরেকটা কাঠামোকে গ্রহণ করতে হবে।

একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র কাঠামো খিলাফতই পারবে এই ইকোনোমিক হিটম্যানদের সমূলে উৎপাটন করতে। কারণ সকল বাস্তবতার উর্ধ্বে অবস্থান হল আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বিধি-বিধান। ব্রিটেন, আমেরিকা এবং অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদি শক্তিদের এবং তাদের কোন কোম্পানির সাথে রাষ্ট্রের অনেক লাভজনক সম্ভাবনা থাকলেও তার সাথে কোন প্রকার চুক্তি একেবারেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এতে করে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে বহিঃশক্তির সাহায্য ছাড়া রাষ্ট্রকে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী বানানোর পরিকল্পনা করতে। এতে করে সেইসব আল্লাহভীরু ব্যক্তিই দায়িত্বে আসবেন যারা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র পলিসিকে সর্বাগ্রে রাখবেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, "...আর আল্লাহ্‌ কখনই মুমিনদের বিরুদ্ধে কাফিরদের জন্য কোনো পথ (প্রাধান্য বা কর্তৃত্বের সুযোগ) রাখবেন না" (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪১)

    -    জাবির জোহান


Previous Post Next Post