আসল ফ্যাক্টর নারী ভোট


খবরঃ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসল ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন দেশের কোটি কোটি নারী ভোটার। ভোটের পুরো সমীকরণই বদলে যেতে পারে এই নারী ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে। ফলে আগামী সরকার কারা গঠন করবেন তা নির্ভর করছে এই নারী ভোটারদের ওপরই। প্রার্থী তালিকায় এবার নারীদের উপস্থিতি হতাশাজনক হলেও ভোটার হিসেবে নারীর গুরুত্ব অতীতের যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি। আর বিশাল এই ভোটব্যাংকের আস্থা অর্জনে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নারীদের জন্য দেওয়া হচ্ছে নানান প্রতিশ্রুতি। আবার কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলদের নারীবিদ্বেষী মন্তব্যকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষেরও আছে মাঠ দখলের চেষ্টা। (https://www.bd-pratidin.com/first-page/2026/02/06/1213573)

মন্তব্যঃ

নির্বাচনমূখী রাজনৈতিক দলগুলো, একদিকে, পশ্চিমাদের সমর্থন হারানোর ভয়ে নারীর প্রতি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছে না, অন্যদিকে, ভোট হারানোর ভয়ে নারীর প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারছে না। ফলে তারা বিভিন্ন রকম উদ্ভট বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে: ‘নারী কর্মজীবনে থাকতে পারবে কি পারবে না’, ‘নারী হাফপ্যান্ট পরতে পারবে কি পারবে না’- এ ধরনের অহেতুক বিতর্কে লিপ্ত হয়ে। অথচ মূল বিতর্ক হওয়া উচিৎ ছিলো- ক্ষমতায় গেলে নারীদেরকে পশ্চিমাদের ন্যায় ‘পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে কিনা, নাকি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ‘সর্বোচ্চ সন্মানের বিষয়’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে?

ধর্মনিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে নারীকে উপস্থাপনের চেষ্টাকারী গোষ্ঠীর জানা উচিত, পশ্চিমা দেশগুলোতে একদিকে নারী স্বাধীনতার তত্ত্ব ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক স্বীকৃতির মাপকাঠি, সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মসহ সকল ক্ষেত্রগুলোর মাধ্যমে নারীকে সামাজিক ও মানসিকভাবে বাধ্য করা হচ্ছে কর্মজীবী হওয়ার সাথে সাথে ‘প্রেজেন্টেবল প্রোডাক্ট’ হতে। নারীর জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে দেহ প্রদর্শন, যৌন আবেদন ও ভিজ্যুয়ালি আকর্ষণমূলক কন্টেন্ট প্রদর্শন করলে অর্থ উপার্জন করা সহজ হয়। ফ্যাশন ও বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মাধ্যমে ‘পারফেক্ট বডি’, ‘পারফেক্ট স্কিন’, ‘অ্যান্টি-এজিং লুক’ না থাকলে নারীদের মধ্যে হীনমন্যতার অনুভূতি তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে নারীকে সমগ্র পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে পণ্য বা মার্কেটিং টুলস হিসেবে বিবেচনা করা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। দুঃখজনক হলো, তাদের অনুকরণে আমাদের দেশের সেক্যুলার শাসক, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবি শ্রেণীও এই নোংরা দৃষ্টিভঙ্গীগুলো ব্যাপকভাবে আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। 

পশ্চিমা সমাজে বাইবেল থেকে নেয়া ‘প্রলোভনের উৎস’ হিসেবে বিবেচনা করে নারীর প্রতি সহিংসতার হাজার হাজার বছরের সংস্কৃতি রয়েছে। যেখানে জোরপূর্বক বিয়ে, সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, শিক্ষা অর্জনে বাধা প্রদান করা, নিজের নামে কোন ধরনের চুক্তি করতে না পারা, ডাইনী হিসেবে বিবেচনা করে নারীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা ইত্যাদির ইতিহাস চলেছে বিগত ১৯ শতক পর্যন্ত। অবশেষে রেনেসাঁ পরবর্তীকালীন সময়ে তথাকথিত ‘নারী স্বাধীনতা’র ধারণা যখন তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন নারী হয়ে গিয়েছে প্রোডাক্ট বা মার্কেটিং টুলস।

এর বিপরীতে ইসলামের রয়েছে নারীকে ‘মা’ কিংবা ‘বোন’ হিসেবে সম্মানিত করার সুদীর্ঘ ইতিহাস। সামষ্টিকভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক ক্ষেত্র সহ রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিয়েতে সম্মতির অধিকার, তালাক প্রদানের অধিকার, মোহরানা বা সম্পত্তিতে অধিকার, শিক্ষা অর্জন উৎসাহ, অভিভাবকের উপর ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলো ইসলামে নারীর মর্যাদাকে অন্যান্য রূপে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই, যে সময়ে ইউরোপে নারীকে ‘coverture’ মনে করা হতো, সেই সময়ে ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসিয়েছে। যেই মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনে সেনাবাহিনী প্রেরণ কারাটাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আজকে তথাকথিত আধুনিক পুঁজিবাদী যুগে পুরো বিশ্বজুড়ে নারী যখন চরম অপমানিত অবস্থায় পতিত হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই নারীর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আর এদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণতো নারীর প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রব্যাবস্থায় শাসিত হওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এবারে নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের কাছেও তাদের এটাই চাওয়া। কোনরকম দোদূল্যবান অবস্থার মধ্যে না থেকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করাই তাদের জন্য ফলদায়ক হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন, “…রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ শাস্তি প্রদানে কঠোর” (সুরা হাশরঃ ৫৭)

    -    মোঃ জহিরুল ইসলাম


Previous Post Next Post