খবরঃ
জুলাই জাতীয় সনদ সংক্রান্ত গণভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচারণা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মো. শফিকুল আলম। প্রেস সচিব বলেন, যারা গণভোট নিয়ে সমালোচনা করছেন তাদের জানার পরিধি কম। কারণ, পৃথিবীর যে সমস্ত দেশে গণভোট হয়েছে সেখানে সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষ নিয়ে থাকে। যেহেতু এই সরকার সংস্কারের পক্ষে তাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলছে। মূলত সংস্কারের সমষ্টিগত প্যাকেজ হচ্ছে গণভোট। যাতে এদেশে অপশাসন অথবা স্বৈরাচার ফিরে না আসে কিংবা শেখ হাসিনার মতো শাহি দৈত্য-দানব না হয় সেজন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। (https://www.jugantor.com/national/1053634)
মন্তব্যঃ
জনগণের অর্থে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ইন্টিরিমের কর্তাব্যাক্তিদের গণভোটের ‘হ্যাঁ‘ প্রচারণা একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যখন গণভোটের বিষয়বস্তু অস্পষ্ট এবং সংস্কার কার্যক্রমে জনগণের আকাঙ্খার প্রতিফলন প্রশ্নবিদ্ধ। ইন্টিরিম তাদের সকল সংস্কার প্রস্তাবকে চারটি বিষয়ে ভাগ করে একসাথে ‘হ্যাঁ‘ অথবা ‘না‘ তে উত্তর দিতে বলছে। যদিও, চারটি পয়েন্টের সাব-পয়েন্টগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। যাই হোক, ইন্টিরিমের সংস্কার প্রস্তাবগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংস্কারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি। এই ভারসাম্যের পিছনে রয়েছে এক অদ্ভুত এক রাজনৈতিক দর্শন। তা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো সুযোগ পেলেই আইন প্রণয়নের সার্বভৌম কতৃত্ব ব্যবহার করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠে, তাই রাষ্ট্র কাঠামোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সরকারী দল কোনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় পূর্ণ কতৃত্ব অর্জন করতে না পারে। কিন্তু, রাজনৈতিক দলগুলের মাঝে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ভাগবাটোয়ার মাধ্যমে সেকুলার ব্যবস্থার সহজাত দুর্বলতা অর্থাৎ শাসককে আইন প্রণয়ণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করার যে ত্রুটি বিদ্যমান, তার সমাধান হচ্ছে কি? বরংএই ভাগবাটোয়ারা দুইটি ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্ধকে চরম মাত্রায় নিয়ে যাবে। Root Cause (মূল কারণ) চিহ্নিত না করে এই ধরনের তথাকথিত সংস্কার কার্যক্রম রাষ্ট্রকে শুধু দুর্বল না, রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য ইয়েমেনের কেসটা দেখা যেতে পারে। ২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে জালিম শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহের পতনের পরে আবদু রাব্বু মনসুর হাদি দুই বছরের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির জন্য শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কার কার্যক্রম। কিন্তু, এই সংস্কার কার্যক্রম ইয়েমেনকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে রাষ্ট্রকে স্থায়ী গৃহযুদ্ধে নিয়ে গিয়েছে।
‘না‘ ভোট মানে আগের সেই জুলুমের ব্যবস্থার টিকে থাকা। যদি আগের ব্যবস্থাই টিকে থাকে তাহলে ছাত্র-জনতার মূল্যবান আত্মত্যাগের কি মূল্য রইল! জনগণ চায় বৈষম্যবিহীন ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তির সুযোগ, ভারত-মার্কিন-বৃটেনসহ সকল প্রকার আধিপত্যবাদী শক্তির বলয় থেকে মুক্তি, এবং জনগণের ইসলামী আবেগ ও বিশ্বাসের নিরাপত্তা। কিন্তু, ইন্টিরিম প্রমাণ করে দিয়েছে জনগণের প্রকৃত মুক্তির আকাঙ্খা পশ্চিমা সেকুলার রাষ্ট্র ব্যাবস্থার কাঠামোর মধ্যে সম্ভব নয়। কারণ সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়া এবং টিকে থাকার জন্য উপনিবেশবাদী শক্তির সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, ইন্টিরিম জনগণের আকাঙ্খার বিপরীতে গিয়ে আমেরিকাকে খুশি করার জন্য গোপন চুক্তি করেছে। আর এখন, ক্ষমতার সম্ভাব্য দাবীদারেরা আমেরিকার প্রতিরিধি দলের সাথে বৈঠক করে ইউনুসের গোপন চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষার কমিটমেন্ট দিচ্ছে। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ বিএনপির চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমিরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির ভার্চুয়াল বৈঠক, দৈনিক ইনকিলাব, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬)।
সুতরাং, জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্খা পূরণ করতে হলে পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া সেকুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন প্রয়োজন। নবুয়তের আদলে প্রতিষ্ঠিত আসন্ন খিলাফতই হচ্ছে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা রাষ্ট্রকে উপনিবেশবাদী শক্তির বলয় থেকে বের করে জনগণের আকাঙ্খার ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করবে। আর শুধুমাত্র তখনই জনগণ প্রকৃত মুক্তি এবং সমৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করবে। ”আর যদি সে সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম..”(আল-আ'রাফ, আয়াত ৯৬)।
- মো: সিরাজুল ইসলাম
-6969ef3cc32cb.jpg)