ফ্যাসিবাদের অবসানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে মহান সংসদের যাত্রা শুরু: রাষ্ট্রপতি



খবর:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। অধিবেশনে শুরুতেই সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। হাজারো শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়েই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।’  তিনি আরো বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণ।’ (https://bangla.thedailystar.net/news/bangladesh/news-3906871)

মন্তব্য:

সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সরকার গঠনের সাথে ফ্যাসিবাদ বিলোপের কোন সম্পর্ক নেই। হিটলার, মুসোলিনি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় এসেছিল। তৎকালীন জার্মানীতে সকল নাগরিকের জন্য সমান, প্রত্যক্ষ ও গোপন ভোটদানের ব্যবস্থা ছিল। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি পল হিন্ডেনবার্গ ১৯৩৩ সালে হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ দিয়েছিল। তারপর সংসদ (রাইখস্টাগ) সদস্যদের আস্থা ভোটে হিটলার আইন প্রণয়নের অসীম ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। তাছাড়া, ইতালির ১৯২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মুসোলিনির দল ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’ (Partito Nazionale Fascista- PNF) সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করে সরকার গঠন করেছিল। অর্থাৎ, নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের সাথে ফ্যাসিজম বিলুপ্ত হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। বরং, সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই ‘ফ্যাসিজম’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

তাছাড়া, কোন একক ব্যক্তির পক্ষে ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিজমের ধারক-বাহক হওয়া অসম্ভব। ফ্যাসিজম হল একটি ব্যবস্থা ও ‘ইকোসিস্টেম’ যার মূলে রয়েছে সংসদের হাতে আইন প্রনয়নের ক্ষমতা প্রদান। জার্মান ও ইতালির ফ্যাসিজম সংবিধানসম্মত ও নির্বাচিত সংসদের সদস্যদের “আইন প্রনয়নের সার্বভৌম ক্ষমতার” হাত ধরে তৈরী হয়েছিল, যা পুরো ইউরোপকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। ঠিক যেভাবে আমেরিকার সংবিধানসম্মত ও নির্বাচিত সিনেটের অনুমোদন নিয়েই ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইরানে জাহেলি যুগের মত বর্বর হামলা করেছে আমেরিকা ও তার দোসররা। মূলত, সেকুলার-পুঁজিবাদি কলোনিয়ালিজমের সাথে জার্মান ও ইতালীয় ‘সেকুলার-ফ্যাসিজমের’ কোন তফাৎ নেই। কিন্তু তারপরেও, পশ্চিমারা ও তাদের ভাব-শীষ্যদের কাছে কলোনিয়ালিজম ‘মহান’।

ফ্যাসিবাদের পতনের সাথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই, যেমনটি হাসিনার পতন পরবর্তী প্রধান ন্যারেটিভ হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রচলন করেছে একটি পক্ষ। ‘ফ্যাসিবাদ’ ও ‘গণতন্ত্র’ শুধুমাত্র একসাথে চলে তাই নয়, বরং গণতন্ত্রের গর্ভেই সেকুলার-ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয়, ঠিক যেভাবে গণতন্ত্রের গর্ভে সেকুলার-পুঁজিবাদ ও উপনিবেশবাদ জন্ম নিয়েছিল। ফ্যাসিবাদ ও সেকুলার-পুঁজিবাদ হল দুই সহোদর ভাই। সুতরাং, বাংলাদেশের জনগণের উচিত এ ধরনের প্রতারণা ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ থেকে সতর্ক থাকা ও এই ন্যারেটিভের প্রচলন ও প্রসারকারীদের সকল কর্মকান্ড ও গতিবিধির উপর সজাগ দৃষ্টি রাখা। পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন, “(হে রাসূল!) আপনি যদি জমিনের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের অনুসরণ করেন, তাহলে তারা আপনাকে আল্লাহ্‌’র পথ হতে বিচ্যুত করে ফেলবে। (কারণ, সুনিশ্চিত জ্ঞান বা ওয়াহী-কে পরিত্যাগ করে) তারা কেবল আন্দাজ-অনুমানের অনুসরণ করে ও তারা বিপথগামীদের অন্তর্ভূক্ত” (সূরা আল-আনআম: ১১৬)। 

    -    রিসাত আহমেদ


Previous Post Next Post