ইরান যুদ্ধের জের ধরে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে এবং জীবনযাত্রার নানা ক্ষেত্রে প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট এর মধ্যেই বেড়েছে। পাশাপাশি শহরের রাইড শেয়ারিং থেকে শুরু করে গ্রামীণ ক্ষেতখামার, পরিবহন খাত, গ্রাম ও শহরের কর্মসংস্থান- বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তারা বলছেন, ধানের ফুল আসার এ সময়ে সেচ না দেওয়ার কারণে পানির ঘাটতি হলে সামনে সংকট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা আছে… আবার, কোনো কারণে ডিজেলের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে কৃষকের সেচের পাম্প ছাড়াও সংকট হতে পারে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও। এর মধ্যেই কিছু এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছে না বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।… (https://www.bbc.com/bengali/articles/c05dee77536o )
মন্তব্যঃ
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানির সংকট এটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশীয় সুযোগ কাজে না লাগিয়ে আমদানি নির্ভর জ্বালানি সরবরাহ ব্যাবস্থা দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে কতটা ঝুঁকি মুখে ফেলতে পারে!
অথচ শাসকদের সদিচ্ছায় কিছু টেকসই নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করলে এ ধরনের সংকট আমাদেরকে স্পর্শও করতে পারত না। যেমন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, সন্তানের সুশিক্ষা ও নিজ জন্মস্থানে দেশের মহামূল্যবান উর্বর ভূমি, খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, বনভূমি, সমূদ্রসম্পদ ইত্যাদি ব্যবহার করে বিভিন্ন শিল্পায়নের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবিকার ব্যবস্থা করে দিলে এত মানুষের ঢাকা শহরে পাড়ি জমানোর প্রয়োজন পড়তো না, যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১০% থেকে ১২% মানুষের জন্য ২০% থেকে ৩০% জ্বালানির প্রয়োজন হয়। তারপর আমদানীকৃত জ্বালানির (ডিজেলের) একটা বড় অংশ (৫০%-৬০%) ব্যয় হচ্ছে পরিবহনে, সেটার প্রয়োজনও অনেক অংশে কমে যেত। নদী গুলোকে পুনরুদ্ধার করে সেগুলোতে সংযোগ খাল খনন করে দিলে খুব সহজেই কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা করা যেতো, যার জন্য প্রয়োজনীয় ২০%-২৫% ডিজেলের প্রয়োজন থাকতো না। সেই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ১০-১৫% ডিজেল লাগে, তা দেশীয় জ্বালানি উৎস, যেমন কয়লা, গ্যাস, সমুদ্র স্রোত, সৌরশক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করলে সেটারও প্রয়োজন হতো না। কক্সবাজার, কুতুবদিয়া চ্যানেল, সন্দ্বীপ চ্যানেল ইত্যাদিতে গবেষণা সাপেক্ষে টার্বাইন বসিয়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে, যা দিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের পুরোটারই বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
কিন্তু এই সকল কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে বিগত সকল মানব রচিত আইন দিয়ে পরিচালিত সরকারগুলো বিভিন্ন দেশীয় ও বিদেশী পুঁজিপতি গোষ্ঠীর স্বার্থে এদেশের জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ খাতকে পরনির্ভরশীল, আমদানি নির্ভর ও ভঙ্গুর করে রেখেছে। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের আজকের এই দুর্দশা।
অথচ জ্বালানি, খনিজ, বিদ্যুৎ খাত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কর্তৃক প্রদত্ত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার নীতিমালা অনুযায়ী গণমালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। গণমালিকানাধীন সম্পদ থেকে প্রতিটি ব্যক্তির সুফল ভোগ করার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিককে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবর্গকে গণ মালিকানাধীন সম্পদের মালিকানা ব্যবহার কিংবা অধিকার দেয়ার অনুমতি রাষ্ট্রের নেই। এখানে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গণমালিকানাধীন সম্পদকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সাথে এটা রাষ্ট্রের জন্য নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক, যেন প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় এবং তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পূর্ণরূপে পূরণ হয়। আরো এটা নিশ্চিত করা হয় যেন, প্রতিটি নাগরিক উন্নত জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রা সুযোগ পায়। আর এটা তখনই সম্ভব যখন আমদানি নির্ভর জ্বালনি সরবরাহ সর্বোচ্চ যতটুকু সম্ভব পরিহার করে, এক্ষেত্রে দেশীয় সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রাকে সহজ করা হবে। আল্লাহর রাসূল (সঃ) শাসকদের কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহ বলেছেন, “হে ক্ষমতার প্রদত্ত, পরীক্ষায় নিপতিত, আত্মপ্রতারিত অধিপতি, সম্পদ একত্রিত করে বেড়াবে এই উদ্দেশ্যে আমি তোমাকে দুনিয়াতে পাঠাই নাই। আমি তোমাকে এই উদ্দেশ্যে দুনিয়াতে পাঠিয়েছি যে, তুমি আমার নিকট মুসলিমের ফরিয়াদ না আসিবার ব্যবস্থা করবে”।
- মোঃ জহিরুল ইসলাম
