জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার সময় হঠাৎই উঠে এসেছে “হবস, লক” দুটি নাম। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদ বিরোধী দলীয় সদস্যদের উদ্দেশে এই চিন্তাবিদদের লেখা পড়ার পরামর্শ দিলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। হবস ও লকের চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সামাজিক চুক্তি’ ধারণা। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য নিজের কিছু স্বাধীনতা রাষ্ট্রের কাছে ন্যস্ত করে এবং এর বিনিময়ে রাষ্ট্র নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান শুধু আইনি দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনের প্রতিফলন। তাই এ নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক দর্শনের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংসদে এই প্রসঙ্গ তোলার মাধ্যমে আইনমন্ত্রী মূলত সংবিধান নিয়ে আলোচনাকে তাত্ত্বিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। (https://www.banglatribune.com/lifestyle/অন্যান্য/939791/হবস-লক-কী-আইনমন্ত্রী-কী-পড়ে-আসতে-বললেন)
মন্তব্যঃ
সরকারি দলের সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান কিংবা বিরোধী দলের সংবিধান সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংসদে যত হট্টগোল ও উত্তেজনাই সৃষ্টি হোক না কেন, সংবিধানের ভিত্তি হিসেবে বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে গ্রহণ করতে উভয় দলের কারোই কোন ভিন্নমত নেই। তাই, সংবিধান ইস্যুতে চলমান বিতর্ক নিরসনের উপায় হিসেবে আইনমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবে বিরোধী দলকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা থমাস হবস, জন লক ও জ্যাক রুশোর বই ও লেখা পড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এসব দার্শনিকদের সকলেই ইউরোপে চলমান প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথোলিকদের অন্তহীন সংঘাতের কারণ হিসেবে ধর্মকে চিহ্নিত করে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করে একটা ধর্মহীন ও সম্পূর্ণ বস্তুগত শাসন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে, হবস, লক ও রুশোর মত দার্শনিকদের সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী জনগণের পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলেও এই চুক্তির ভিত্তি সম্পর্কে বিশদ কোন ব্যাখ্যা দিতে সমর্থ হয় নি। তারা “সাধারণ ইচ্ছা”কিংবা “সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করলেও এসব শব্দগুলো অস্পষ্ট হওয়ায় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেনি কারণ সমাজে বহুবিধ মতামতের অস্তিত্ব রয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে “সাধারণ ইচ্ছারও” পরিবর্তন হয়। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি ছাড়া, এই ধরনের চুক্তি একটি সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না, জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করবে এবং ক্ষমতা ও প্রভাবশালীদের নিজেদের সুবিধার্থে চুক্তির শর্তাবলী পরিবর্তন করার সুযোগ করে দেবে যে নির্মম বাস্তবতা আমরা সকল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রেই লক্ষ্য করছি।
এছাড়া সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব স্রস্টার ক্ষমতাকে (Divine Right) অস্বীকার করে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করে সংবিধানের ভিত্তি হিসেবে যে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাটির উদ্ভব করেছে তা মুসলিম বিশ্বে প্রয়োগযোগ্য নয়। কারণ স্রষ্টাবিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মুসলিমদের ঈমান-আক্বীদা, চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-অনুভুতির পরিপন্থী। তাই স্রস্টা বিবর্জিত ভিত্তি ও মুসলিমদের ঈমান-আক্বীদাহ্ পরিপন্থী সংবিধানের ভিত্তিতে মুসলিমরা কখনোই ঐক্যবদ্ধ হবে না, এদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠীর বিষয়টি জানা উচিত।
রাষ্ট্রের সংবিধান ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার একমাত্র কার্যকরী ভিত্তি হচ্ছে ইসলামী আক্বীদাহ্র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ‘মদিনা সনদ’ যা মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং পরবর্তী খিলাফত ব্যবস্থার সংবিধানের মডেল হিসেবে কাজ করেছিল। এই মদিনা সনদ ও তদপরবর্তী ইসলামী সংবিধানের অধীনে নাগরিকগণ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়পরায়ণ শাসনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং একটি বহুদলীয়/বহুধর্মীয় সমাজে প্রকৃত স্থিতিশীলতা এসেছিল। জীবন সম্পর্কিত বিভিন্ন চিন্তা (Concept), মাপকাঠি (Criteria) ও দৃঢ় বিশ্বাসগুলোকেও (Convictions) উম্মাহ্ ঐক্যবদ্ধভাবে গ্রহণ করেছে। তাই ইসলামী আক্বীদাই হচ্ছে মুসলিমদের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের সংবিধানের একমাত্র ভিত্তি। ইসলামী আক্বীদা পরিপন্থী এবং হবস, লক ও রুশোদের উদ্ভাবিত স্রস্টা বিবর্জিত কোন ভিত্তিকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের সংবিধানের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত নয়। কুর‘আন-সুন্নাহ্’র ভিত্তিতে হিযবুত তাহ্রীর কর্তৃক প্রণীত খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ এ বলা হয়েছে, “ইসলামী আক্বীদাহ্ হলো রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, কাঠামো, জবাবদিহিতা কিংবা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত অন্য কোন বিষয়, যা কিনা ইসলামী আক্বীদাহ্ হতে উৎসারিত নয়, তা রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না। একই সময়ে, ইসলামী আক্বীদাহ্ রাষ্ট্রের সংবিধান এবং আইন-কানুনের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে; তাই, সংবিধান এবং আইন-কানুনের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন বিষয়ও রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না, যা কিনা ইসলামী আক্বীদাহ্ হতে উদ্ভূত নয়”।
- কাজী তাহসিন রশীদ
