খবরঃ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত আলী হুসেনকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ ও হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আলী হুসেনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬ মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। (https://bangla.thedailystar.net/youth/education/campus/news-696966)
মন্তব্যঃ
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র তার মতের সাথে অমিলের অপছন্দ প্রকাশে চিন্তার জগতে এত এত চিন্তার উপাদান থাকার পরেও এবং বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে এত এত শব্দ থাকার পরেও কেন ধর্ষণের চিন্তা এবং ধর্ষণ শব্দটি মতপ্রকাশে ব্যবহার করল, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। একটা সমাজ গঠিত হয় জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইনের প্রয়োগের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরির মাধ্যমে। ধর্ষণ, হত্যা, দুর্নীতি- এ জাতীয় চিন্তাগুলো এবং শব্দসমূহ প্রকাশিতভাবে বা মৌখিকভাবে নেতিবাচক বিষয় হলেও ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী সমাজে এর প্রয়োগের বিপরীত চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। যেমন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের পুত্ররা যদি ধর্ষণ বা খুন করে, তবে তার বিরুদ্ধে কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। এস আলম সাহেবরা হিসাব করা দুঃসাধ্য এরকম পরিমাণ টাকা লুট করে নিয়ে যায়, তবু পুরো বিশ্ব মিলেও তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পারে না। কর ফাঁকি দিয়ে টাকা পাচার করা মানুষদের আইনের আওতায় তো আনাই হয় না, বরং তাদের টাকা ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্র তাদের কর কমিয়ে দেয়। আবার আইনের অবাস্তবায়নও ধর্ষণের মত গুরুতর অপরাধকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুসারে, ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত ৬৩০৫ টি ধর্ষণ হয়েছে। এ ধরনের ধর্ষণ মামলার গড়ে ১ শতাংশেরও কম বিচার হয়। (https://www.dhakatribune.com/bangladesh/laws-rights/24141/less-than-1%25-ever-gets-punished-for-rape?utm_source=chatgpt.com)। যার জ্বলন্ত প্রমাণ হল এই অনৈতিক উক্তিকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শুধু ৬ মাসের সাময়িক বহিষ্কারাদেশ জারি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় কোন আইনি ব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি।
এ সকল কিছুই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সমাজের সবার কাছেই দুইটা বার্তা দেয়। একটা হল- জোর যার মুল্লুক তার। অর্থাৎ, গুম করা, খুন করা, লুট করা, ধর্ষণ করা ইত্যাদি সবকিছুই ক্ষমতাশালী ও বিত্তশালী মানুষের কাজ। দ্বিতীয় হল- অপরাধ করলেই সবসময় শাস্তি হয় না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাবির কোন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা অনুভব করা ছাত্র মাত্রই র্যাগ দেয়া, চাদাবাজি করা এবং ধর্ষণ করাকে কিংবা ধর্ষণ করব বলে হুমকি দেয়াকে ক্ষমতার প্রদর্শন বলেই মনে করে। শুধু আইনের বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে সুশীল প্রতিনিধিরা পশ্চিমা দেশের গুণকীর্তন করে। কিন্তু পশ্চিমা দেশও বাংলাদেশের চেয়ে খুব এগিয়ে নেই। সেখানেও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা অন্যায় করে বেঁচে যায়। যেমন-২০১১ সালে ডমিনিক স্ট্রস কান আইএমএফ এর সাবেক প্রধান যার বিরুদ্ধে হোটেলের মেইডকে ধর্ষণের চেষ্টার মামলার নিষ্পত্তি অমীমাংসিতই থেকে যায়। বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২৫জনেরও বেশী মহিলা যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনে। কিন্তু কৌশলগতভাবে তাকে ক্রিমিনাল কোর্টে শাস্তি না দিয়ে, সিভিল কোর্টে শুধু জরিমানা করা হয়। আইনের প্রয়োগের অবস্থাও ভয়াবহ। ২০২১ সালের পেন্টাগন রিপোর্টে ২৬০০০ যৌন হেনস্থার অভিযোগ আসে যার মধ্যে শাস্তির হার মাত্র ০.৬ শতাংশ। ফ্রান্স এবং কানাডার সামরিক স্থানেও হলিউডের আদলে #মি-টু আন্দোলন হয়েছে, যেখানে শাস্তির হার ১-২ শতাংশ।
অর্থাৎ, পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ জীবনব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাহীনদের উপর অত্যাচার করবে এবং আইনও ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ আইন তৈরিই করে পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিরা নয়তো পুঁজিপতিরা নিজেরাই। এতে করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ক্ষমতাসীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার নোংরা প্রদর্শন করা খুবই স্বাভাবিক মনে হয়। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের ধর্ষণের হুমকি দেয়া বিচ্ছিন্ন না বরং সেক্যুলার জীবনব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিফলন।
একমাত্র ইসলামি জীবনব্যবস্থার পক্ষেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইনের প্রয়োগের ভারসাম্য এমনভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব যেন ধণী গরিব, নারী-পুরুষ সকলের মধ্যে প্রশান্তি বিস্তার করবে। কারণ ইসলামে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হল- মুল্লুক যার জোর তার। অর্থাৎ, আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক সৃষ্ট দুনিয়াতে তিনিই সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর। মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আসের পুত্র পিতার ক্ষমতার অহংকারে খ্রিষ্টান যুবককে প্রহার করে। খলিফা ওমর (রাঃ) এর কাছে এই অভিযোগ আসলে তিনি সেই খ্রিষ্টান যুবককে গভর্নরের পুত্রকে প্রহারের সুযোগ করে দেয়। তাছাড়াও ধর্ষণের মত গুরুতর শাস্তি হুদুদের প্রকাশ্য বাস্তবায়ন প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে ধর্ষণের চিন্তা বা এ নিয়ে কথা বলাও নাগরিকদের জন্য অকল্পনীয় করে তুলেছিল। এরকম একটা জীবনব্যবস্থাই আমাদের মেধাবী থেকে শুরু করে প্রত্যেক নাগরিকের মনজগতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা’র প্রতি ভালোবাসা ও ভয় পরিপূর্ণ থাকবে এবং যারা এরপরেও অপরাধ করবে তাঁদের উপর প্রয়োগ করা শাস্তি বাকি নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করবে।
- জাবির জোহান
