অর্থনীতির কোনো সূত্রই কাজে আসছে না বাংলাদেশে

 

খবর:

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে, যেখানে অর্থনীতির কোন সূত্রই কাজ করছে না। একদিকে প্রবাসী আয় ও রফতানি আয় বাড়ার কারনে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। অন্যদিকে বাড়ছে মুদ্রাস্ফিতি, কমছে মূলধনী যন্ত্রের আমদানি। উৎপাদশীল খাতে বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান থমকে গেছে, ফলে বাড়ছে বেকারত্ব। (https://dbcnews.tv/articles/152038)

মন্তব্য:

অর্থনীতির কোন সূত্রই বাংলাদেশে কাজ না করার বিষয়টি নতুন কোন আবিষ্কার নয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই এই বিষয়টি চলে আসছে মূলত দুটি কারণে; পুঁজিবাদী অর্থনীতির জন্মগত ত্রুটি এবং রাজনীতিবিদ নামধারী সেকুলার শাসকগোষ্ঠীর মজ্জাগত স্বার্থান্বেষী কর্মকান্ড। তা না হলে পৃথিবীর ৮ম বৃহত্তম কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড), পরিশ্রমে অভ্যস্থ ও অল্পে তুষ্ট জনগণ, জলে-স্থলে মিলে প্রায় ৫ হাজার বিলিয়ন ডলারের মূল্যবান খনিজ ও জ্বালানী সম্পদ, পৃথিবীর অন্যতম উর্বর মাটিসমৃদ্ধ কৃষিজমি, পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ডায়াসপোরা ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী জনগোষ্ঠী (অন্তত ৭৫ লক্ষ প্রবাসী) থাকার পরও বাংলাদেশ এখনো কেন গরীব দেশের তালিকায়!? তথাকথিত বাজার অর্থনীতির সূত্র যদি বাংলাদেশে বা পৃথিবীর কোথাও কাজ করত তাহলে বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রধান ৫টি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশসমূহের একটি হত। মূলত ‘বাজার অর্থনীতি’ হল পশ্চিমাদের পোষ্ট-কলোনিয়াল (post-colonial) নিষ্পেষন ও নিয়ন্ত্রনের একটি হাতিয়ার। পশ্চিমারা মুসলিম দেশগুলোর ব্যাপারে বাজার অর্থনীতির সূত্র আউড়ায় আর নিজেদের অর্থনীতির বেলায় বলে “অর্থনীতি কোন জঙ্গল নয়, অর্থনীতি হল সুসজ্জিত বাগানের মত যেখানে নিয়ন্ত্রন না থাকলে আগাছা জন্মায়”। 

পুঁজিবাদি ‘ট্রিকল ডাউন’ অর্থনীতি গুটিকয়েক ব্যবসায়ীক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে, যা সবার কাছে এখন স্পষ্ট। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এর কারণেই হাসিনার আমলে বাংলাদেশে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহতম আয় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল, সম্পদের পাহাড় গড়েছিল তার দলীয় একটি গোষ্ঠী। হাসিনার পতনের পর তার দলীয় ক্যাডার ও সন্ত্রাসীদের ‘ব্যবসায়ীক সাম্রাজ্য’ আপোষে কিংবা জোর খাটিয়ে দখল করা শুরু করে নতুন রাজনৈতিক লুটেরা গোষ্ঠী। বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহত্তম এই হাতবদলের রাজনৈতিক খেলায় হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে, চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দখলের আশায় প্রভাব খাটিয়ে বন্ধ রেখেছে দীর্ঘদিনের ক্ষুধার্তরা, কিন্তু তাদের দলীয় সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত আইনগত দিকগুলো ‘ঠিকঠাক’ করে দখলে নিতে পারছে না। এই নব্য মনিবগোষ্ঠী ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে দেশের অর্থনীতিতে তৈরী করেছে এক নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা। 

কিন্তু ‘বিশিষ্ট’ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বতী সরকার এই সরল বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়ে “বাজার অর্থনীতির সূত্র কেন কাজ করছে না?” এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ১০টি গবেষণাপত্র বা পলিসি নোট প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নীতিগত দৃষ্টিকোণ ও অভিজ্ঞতামূলক বিশ্লেষনের (!) আলোকে সরকারী অর্থ ব্যয়ে এই গবেষণাপত্রগুলো তৈরী করা হবে যা মূলত সরকারের পছন্দের ‘অভিজ্ঞ গবেষকদের’ পকেট ভারি করার একটি আয়োজন। এই বিশাল অর্থ ব্যয়ের উপলক্ষ্য তৈরী করতেই অর্থনীতির সূত্র কাজ না করার আলোচনা বাজারে ছাড়া হয়েছে। বাংলাদেশের জনগনের দুর্ভাগ্য যে হাসিনার পতনে তারা ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পরেছে। পুঁজিবাদের নতুন লাঠিয়ালরা জনগনকে আগের মতেই খুঁবলে খাওয়ার আয়োজন করেছে। 

    -    রিসাত আহমেদ


Previous Post Next Post