খবরঃ
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ (এনসিটি) চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো স্থাপনা দেশি-বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। মিছিলটি চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার দিকে যেতে চাইলে বাধা দেয় পুলিশ। আজ বুধবার সকালে নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় এসব কর্মসূচি পালিত হয়। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/c7wqfxjp7h)
মন্তব্যঃ
চট্টগ্রাম বন্দরের মত একটা সমুদ্রবন্দর একটা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান। বৈদেশিক রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন কূটনৈতিক সম্পর্কে এগিয়ে থাকার জন্য এধরনের কৌশলগত অবস্থান একটা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রাম বন্দর যদি সিংগাপুরের মত আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বন্দর হয়ে যায় তাহলে সমস্যা কোথায়? এখানে আমাদের বুঝতে হবে যে সমুদ্র বন্দর কোন শো-পিস প্রজেক্ট নয়; বরং সমুদ্র বন্দরের সাথে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, বাজারের দ্রব্যমূল্য, বন্দরের প্রকৃত উন্নয়ন ইত্যাদি সবকিছুই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাহলে বন্দর বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্তটা কার পক্ষে যাচ্ছে তা পর্যালোচনা করা উচিৎ। প্রথমতঃ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা। সমুদ্র বন্দর একটা রাষ্ট্রের কৌশলগত জায়গা (Strategic Point)। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর এবং এর সাথে যুক্ত সকল বন্দরসমূহ এখন যুক্তরাষ্ট্র (Indo-Pacific Strategy) ও চীনের (One Belt One Road) আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের অন্যতম কৌশলগত জায়গা। এছাড়াও বাংলাদেশের নৌবাহিনীর ঘাঁটিও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের খুবই সন্নিকটে। যেকোন প্রতিরক্ষা সামগ্রী পরিবহণের কাজে এই বন্দর ব্যবহৃত হয়। এ প্রেক্ষিতে, ইজারা গ্রহীতা হিসেবে যে দুটি কোম্পানির নাম সামনে আসছে – ডেনিশ কোম্পানি A.P. Moller – Maersk (Maersk) এবং আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড- দুটোর সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের যথাক্রমে সামরিক ও নৌবাহিনী চুক্তি এবং কাস্টমস-ট্রেড পার্টনারশিপ অ্যাগেইনস্ট টেরোরিজম’ (C-TPAT) এর চুক্তি আছে। তাই এ ধরনের বিদেশি অপারেটরের হাতে বন্দরের কোনো স্থাপনা ইজারা দেয়ার অর্থ হল রাষ্ট্রের কৌশলগত স্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়া। দ্বিতীয়ত, একটা রাষ্ট্র যেভাবে তার শ্রমিকদের দেখভাল করতে বাধ্য সেভাবে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানি শ্রমিকদের দেখভাল করতে বাধ্য না। বরং মুনাফা সর্বোচ্চকরণের পথে প্রথমেই শ্রমিকরা হবে বাঁধা। স্বয়ংক্রিয়তা ও দক্ষতা পরীক্ষার নাম করে শ্রমিকদের ছাটাই করা, স্থায়ী চাকরির সুযোগ-সুবিধা বাদ দিয়ে শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নিয়ে আসা ইত্যাদি সবই শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের ৯০ ভাগ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দর দিয়ে হয়। বিদেশি কোম্পানি চাইলেই নিজেদের বিভিন্ন সার্ভিস ফি বাড়িয়ে নিতে পারবে। সরকার ইতোমধ্যেই ৪১ শতাংশ ট্যারিফ বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্যারিফসহ পণ্যের বর্ধিত মূল্যের উপর শতকরা হারে সার্ভিস চার্জ নিলে তা দ্রব্যমূল্য বাড়াবে। এতে করে সাধারণ মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ হবে। চতুর্থত, বন্দরের উন্নয়নগত সমস্যা যেমন সামুদ্রিক গভীরতা কম, সীমিত বার্থ সংখ্যা, ইয়ার্ডে জায়গার অভাব, পুরনো যন্ত্রপাতি, জাহাজের টার্ন এরাউন্ড টাইম বেশি, ম্যানুয়াল ও পদ্ধতিগত বিলম্ব, মডার্ন অটোমেশনের অভাব ইত্যাদি সবই এর কৌশলগত গুরুত্বের দিকে তাকিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষেই সমাধান করা সম্ভব। বিদেশি কোম্পানি এগুলো ততটুকুই সমাধান করবে যতটুকু তার মুনাফা অর্জনে প্রয়োজন। সামগ্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়ে বাইরের কোম্পানির মাথাব্যথা না থাকাটাই স্বাভাবিক। --- তাহলে যে পদ্দক্ষেপ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, শ্রমিক ও জনমানসের স্বার্থবিরোধী, বন্দরের উন্নয়নে অনিশ্চয়তা রক্ষাকারী- সেই পদক্ষেপ নিতে কেন উদগ্রীব সরকার? ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে গ্যাসফিল্ডে মার্কিন Occidental Petroleum Corporation কে ইজারা দিয়ে যে সর্বনাশের সূচনা হয়েছিল সেখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে কেন আবারো সমুদ্রবন্দরের বেলায় একই ভুল করতে যাচ্ছে সরকার?
মূলতঃ এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং তার পরিষদবর্গ সাম্রাজ্যবাদি আমেরিকার পুতুলমাত্র। বিগত রাজনৈতিক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর মতই এরাও সাম্রাজ্যবাদিদের প্রতিনিধি। তাই সাধারণ শ্রমিকের চোখেও যা মারাত্মক পর্যায়ের ভুল এবং অন্যায়, তা তাদের কাছে অমোঘ নির্দেশস্বরূপ। রাষ্ট্রের সত্যিকারের উন্নয়ন তখনই ঘটবে যখন রাষ্ট্রের শাসক সাম্রাজ্যবাদিদের নিয়ন্ত্রনমুক্ত হবে।
নব্য উপনিবেশবাদি ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদিদের নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত হওয়ার কোন সমীকরণ নেই। এই সমাধান আছে একমাত্র ইসলামি জীবনব্যবস্থায়। রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ কখনোই বহিঃরাষ্ট্রের কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রাখার প্রশ্নই আসে না। অতি প্রয়োজন হলে বিদেশি বিশেষজ্ঞ কারো কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের জ্ঞান বা প্রযুক্তি শেখা যেতে পারে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: “এবং কিছুতেই আল্লাহ্ মু‘মিনদের উপর কাফিরদের কর্তৃত্বের কোন পথ রাখবেন না” [আন-নিসা: ১৪১]।
- জাবির জোহান
