খবরঃ
গত ৩রা নভেম্বর বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) এর চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী তার নিজস্ব ফেসবুক ওয়ালে লিখেন-বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গুণ হলো শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাউন্স ব্যাক করার অদ্ভুত ক্ষমতা। উক্ত পোস্টে তিনি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের এফডিআই চিত্র +১৯.১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সরকারের ইকোনোমিক সাফাল্য হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণত গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিদেশী বিনিয়োগ প্রচন্ডভাবে হ্রাস পেলেও বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত প্রয়াসে এটি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
মন্তব্যঃ
কিছুদিন আগে “অর্থনীতির কোন সূত্রই কাজে আসছে না বাংলাদেশে”-এমন খবর গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশের পর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের এফডিআই বৃদ্ধি পেয়েছে এমন সংখ্যা সরকারকে মুখরক্ষার সুযোগ করে দিলেও তা কি জনমনে প্রকৃতঅর্থে স্বস্তি এনেছে? জনগণের সার্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিছুটা কি আগের থেকে বেড়েছে? এফডিআই বাড়ার ফলে আমরা কি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছি? ৫৩ বছর ধরে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডহীনতায় ভোগা দেশের দূর্ভাগা জনগোষ্ঠী হয়ে এমন প্রশ্ন আমরা উত্থাপন করতেই পারি। শিশুকালের মত সরল অংকের ছকে এফডিআই বৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে, মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধি তথা বিদেশি টাকা প্রবেশ →মানে বিনিয়োগ বেড়েছে →তথা উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে→ফলে, নতুন কারখানা বা প্রতিষ্ঠান খোলায় স্থানীয়দের চাকরি হয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে → এবং, বিদেশি কোম্পানি থেকে সরকার কর পেয়ে সরকারের কর রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে→ সর্বোপরি সরকারে GDP বৃদ্ধি পেয়েছে → অর্থ্যাৎ, দেশের অর্থনীতি উন্নত হয়েছে। কিন্তু, এ ছকের বিপরীতে আরো একটি বিপরীত সরল চিত্র রয়েছে যেটা প্রায়শই আমরা উপেক্ষা করি। তা হচ্ছে, মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধি তথা বিদেশি টাকা ঢোকেছে →অর্থ্যাৎ, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে → মানে, বিদেশি কোম্পানিগুলো লাভের বড় অংশ নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে → দেশীয় সম্পদ বেরিয়ে যাচ্ছে তথা লাভ বিদেশে চলে যাচ্ছে, স্থানীয় ভ্যালু চেইন গড়ে উঠছেনা → বড় বিদেশি কোম্পানি স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পকে চাপের মুখে ফেলে বন্ধ করে দিচ্ছে → অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগকারী চায় সরকার তাদের জন্য নীতিমালা শিথিল করুক → ফলে, দেশের নীতিগত স্বাধীনতা কমে যাচ্ছে→ সরকারের কর রাজস্ব আয় কমছে→ আবার, অনেক বেশি FDI দেশকে “low-wage economy” তে নামাচ্ছে ফলে, দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংযোজন কম হচ্ছে এবং দেশ FDI-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে তথা আমাদের অর্থনীতি পরনির্ভরশীল হচ্ছে।
অর্ধশতক বয়সের একটা দেশের শাসকগোষ্ঠীর এখনো পরনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন দেখার এবং জনগণকে সে স্বপ্নে বিভোর হওয়ার ভীশন দেখানো কতটুকু বুদ্ধিদীপ্ত বা সুচিন্তিত পদক্ষেপ? FDI নির্ভর অর্থনীতির রূপরেখা ছাড়া পৃথিবীতে কি অন্যকোন অর্থনীতির রূপরেখা নেই যা একটা দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে পারে? অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু, গোলামির জিঞ্জির গলায় ঝুলিয়ে সেরকম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সাহসকিতা কোন শাসকগোষ্ঠীর থাকবেনা এটাই সত্য। মূলত, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পশ্চিমাদের প্রণয়ন করা পূঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি গ্রহণ করায় জাতি হিসেবে আমাদেরকে সব সময় পশ্চিমাদের প্রেসকিপশনে চলতে হচ্ছে। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এই প্রেসকিপশনেরই অন্যতম ঔষুধ হচ্ছে FDI বৃদ্ধি। যা মূলত, তারা IMF, World Bank এর পলিসি হিসেবে পুশ করে। যা এ অঞ্চলের অল্পকিছু জনগোষ্ঠীর জন্য কামলা খেটে কিছু টাকা উপার্জনের সুযোগ করে দিয়ে পুরো দেশের অর্থনীতিকে পরনির্ভশীল করে তোলে। অথচ, এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলাম আমাদেরকে একটি নেতৃত্বশীল অর্থনৈতিক রূপরেখা দিয়েছে। যা পূর্বে যেমন আরবের মত বেদুঈন, মরভূমির জাতিকে বিশ্বে নেতৃত্বশীল করেছিলো, বর্তমানে তা বাংলাদেশের মত বহুলজনগোষ্ঠীর এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের দেশকেও দ্রুততার সাথে বিশ্ব নেতৃত্বে নিয়ে যেতে পারবে। বর্তমান সরকারের গৃহীত নীতিমালার সিংহাভাগই FDI নির্ভর হলেও ইসলাম আমাদেরকে দিচ্ছে ভারী শিল্পভিত্তিক স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতির রূপরেখা। যা শুধু আমাদেরকে সুপার পাওয়ার হিসেবেই আভির্ভূত করবেনা বরং কৃষি, খাদ্য, জ্বালানী, শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য থেকে শুরু অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ং সম্পূর্ণ করবে।
- আসাদুল্লাহ্ নাঈম