খবরঃ
…এনটিএমসির বদলে গঠন করা হবে সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট (সিআইএস) নামে নতুন একটি সংস্থা, যা আধা বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন নিয়ে আড়িপাতার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।…সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইনানুগ ইন্টারসেপশনের (আড়িপাতা) সংজ্ঞা এবং পরিধি স্পষ্টভাবে এবং সুবিস্তারে আইনে নির্ধারিত করা হয়েছে। কেবল বিচারিক ও জরুরি আইনানুগ আড়িপাতার প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট' (সিআইএস) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। …জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্ঙ্খলা, জরুরি প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে, বিচারিক বা তদন্তের প্রয়োজন এবং আন্তঃসীমান্ত সংক্রান্ত কাজে সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে আইনানুগ আড়িপাতার কাজ করতে পারবে। এ কাজ শুধু আইনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত নির্দিষ্ট কিছু সংস্থা, সেটিও কেবল নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে করতে পারবে। (https://bangla.bdnews24.com/business/d68934a8e1b7)
মন্তব্যঃ
পতিত যালিম হাসিনা সরকার জনগণের অতি-ব্যাক্তিগত ফোন যোগাযোগের উপর নিবিড় নজরদারির জন্য এনটিএমসি নামক একটি কুখ্যাত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছিল। এনটিএমসির মাধ্যমে হাসিনা সরকার জনগণের ব্যাক্তিগত ফোন কল ফাঁসসহ নানা ধরনের অপকর্মের মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যক্তিগত যোগাযোগকে ভীতিকর করে তুলেছিল। জনগণ ভেবেছিল হাসিনার পতনের সাথে সাথে জুলুমের এই কাঠামোর অস্তিত্বও বিলীন হবে। কিন্তু, জনগণ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ছাত্র-জনতার রক্তের উপর নিয়োগ পাওয়া ইন্টিরিম জনগণের ব্যক্তিগত পরিসরে নজরদারির কাঠামো এনটিএমসি বাতিল করতে তালবাহানা করছে। অবশেষে, ব্যাপক চাপের মুখে তারা এনটিএমসি বাতিল করলেও নাম পরিবর্তন করে প্রতারণামূলকভাবে সিআইএস নামক নতুন একটি আধা-বিচারিক সংস্থা গঠন করছে জনগণের ফোনে আড়িপাতার জন্য। অর্থাৎ, স্বৈরাচারী হাসিনার মত জনগণের রক্তের ম্যান্ডেটে নিয়োগ পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারও জনগণের ব্যক্তিগত পরিসরে নজরদারির অবারিত সুযোগ চায়।
শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক জনগণের ব্যাক্তিগত পরিসরের উপর নজরদারির তীব্র আকাঙ্খা বর্তমান পুঁজিবাদী-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি সহজাত দুর্বলতা প্রকাশ করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের ইচ্ছাকে মহিমান্বিত করা এই ব্যবস্থার শাসকগোষ্ঠী কেন জনগণের গোপনীয়তার অধিকার হরণ করতে এতটা উদগ্রিব? যদিও, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রোমোট করার সময় জনগণকে মহিমান্বিত করার জন্য বিজ্ঞাপনের স্লোগাণ হিসেবে তারা বলে “Democratic Government of the people, by the people, for the people”। কিন্তু, বাস্তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বা গণঅভ্যুত্থানে জনগণের রক্তের মাধ্যমে কোন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসলেও গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সরকারের ক্ষমতা উপনিবেশবাদী আমেরিকা-বৃটেনের সমর্থণের উপর নির্ভরশীল। তাই শাসন ক্ষমতায় যেই বসুক না কেন তাকে উপনিবেশবাদী আমেরিকা-বৃটেনকে খুশি করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়। উপনিবেশবাদী আমেরিকা-বৃটেনের স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থ কখনও এক হতে পারে না। তাই জনগণ সরকারের উপনিবেশবাদীদের তুষ্ট করার নীতি এবং কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। জনগণের এই স্বাভাবিক প্রতিবাদকে দমন করার জন্য সরকারগুলোর জনগণের উপর নজরদারি করার মত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিচালনার জন্য কালো আইন প্রয়োজন হয়। এই ব্যবস্থায় মানুষের ব্যাক্তিগত যোগাযোগ গোপনীয়তার অধিকার সার্বজনীন নয় বরং এটিকে তাদের জুলুমের শাসনের অস্তিত্বেরর জন্য হুমকী মনে করে।
ইসলামে জনগণের ব্যাক্তিগত পরিসরের গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি পবিত্র দায়িত্ব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা বেশিরভাগ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কেননা, অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ। তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অপরের পেছনে নিন্দা করো না।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)। মুসলিমদের প্রতিনিধি হিসেবে খলিফা তথা খিলাফত রাষ্ট্রের উপরেও একই হুকুম প্রযোজ্য। খিলাফত রাষ্ট্রের জন্য জনগণের ব্যাক্তিগত পরিসরে নজরদারি বা গোয়েন্দাগিরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মুকদাদ ও আবু উমামাহ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, “যদি কোন আমীর তার লোকদের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন তাহলে তিনি তাদেরকে অপমানিত করলেন।“ (সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৮৮৯ এবং আল হাইছামী, মাজমা’ আল-জাওয়ায়িদ, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১৮)। উল্লেখ্য, নজরদারির এই হুকুম খিলাফত রাষ্ট্রের মুসলিম-অমুসলিম সকল নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। রাষ্ট্র বিশেষ প্রয়োজনে এবং শারীয়াহ নির্ধারিত ক্ষেত্রে যেমনঃ শত্রু রাষ্ট্র (আমেরিকা, বৃটেন, ভারত ইত্যাদি), সম্ভাব্য শত্রু রাষ্ট্র এবং শত্রু বা সম্ভাব্য শত্রেুর সাথে ঘন ঘন যোগাযাগ রক্ষাকারী নাগরিকদের (মুসলিম এবং অমুসলিম) উপর যুদ্ধের কৌশল হিসেবে নজরদারি করতে পারবে। (বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ হিযবুত তাহ্রীর কর্তৃক কুরআন-সুন্নাহ্’র ভিত্তিতে প্রণীত খিলাফত ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহ (শাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা), বাংলা ভার্সন, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ, পৃষ্ঠা ৬৬)। সুতরাং, জনগণের সার্বজনীন ব্যাক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নবুয়তের আদলে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আর কোন বিকল্প নাই।
- মো: সিরাজুল ইসলাম
