আজ ৩ মার্চ। আজ থেকে ঠিক ১০২ বছর আগে, ১৯২৪ সালের এই দিনে তুরস্কের পার্লামেন্ট বা গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব থেকে ইসলামী খেলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সর্বশেষ খলীফা দ্বিতীয় আবদুল মাজিদসহ পুরো উসমানীয় রাজপরিবারকে তুরস্ক থেকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানো হয়। (https://insaf24.com/news/03/03/2026/250248 )
মন্তব্য:
ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তথা খিলাফতের ধ্বংসের ১০২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংসের পর ৫০টিরও বেশী খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মুসলিম বিশ্ব সহ, বাকি রাষ্ট্রগুলো পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং সামাজিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী বেড়েছে। অল্প কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
মুসলিম বিশ্বে এই সংকট আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার নেতৃত্বে Gaza Strip ও West Bank-এ সন্ত্রাসী সংগঠন ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব ও সংঘাত মুসলিমদের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। Yemen-এ দীর্ঘ যুদ্ধ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। Syria ও Iraq-এ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একইভাবে Myanmar-এ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের কারণে তারা নিজ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে এবং অনেকেই বর্তমানে Cox's Bazar-এর শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। Iran, Libya, Sudan এবং Somalia-এর মতো দেশগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতে ভুগছে।
এই বাস্তবতা আমাদেরকে ইতিহাসের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। যখন ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা খিলাফত বাস্তবায়িত ছিল, তখন মুসলিম সমাজ শুধু জ্ঞান ও সভ্যতায় নয়, বরং নিরাপত্তা, মানসিক স্থিতি এবং সামরিক শক্তিতেও উন্নত ছিল। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে Baghdad-এ প্রতিষ্ঠিত House of Wisdom ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান গবেষণা ও জ্ঞানকেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন ভাষার বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গ্রন্থ অনুবাদ ও গবেষণা করা হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানে Ibn Sina তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Canon of Medicine রচনা করেন, যা বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গণিত ও বিজ্ঞানে Al-Khwarizmi algebra ও algorithm-এর ভিত্তি স্থাপন করেন, আর Al-Biruni জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলে অসাধারণ অবদান রাখেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও মুসলিম সমাজ উন্নত ছিল। Al-Andalus-এ শত শত লাইব্রেরি, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। Cordoba শহরটি একসময় ইউরোপের অন্যতম জ্ঞানকেন্দ্র ছিল, যেখানে হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। শুধু জ্ঞান ও অর্থনীতিই নয়, খিলাফতের সময় সমাজে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কথাও ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও আইনশৃঙ্খলার কারণে মানুষ নিজেদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা অনুভব করত। ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, Umar ibn al-Khattab-এর খিলাফতের সময় একজন নারী দীর্ঘ পথ একা ভ্রমণ করলেও নিরাপদ অনুভব করত । সামরিক শক্তির ক্ষেত্রেও খিলাফত একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, Fall of Constantinople-এর মাধ্যমে মোহাম্মদ আল ফাতহের এর নেতৃত্বে উসমানীয় বাহিনী শক্তিশালী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী দখল করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো আমাদের দেখায় যে, যখন মুসলিমেরা যখন ইসলামের আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা খিলাফত দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন সেই সমাজ জ্ঞান, বিজ্ঞান, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়। আজকের মুসলিম বিশ্বের সংকট এবং অতীতের সাফল্যের এই বৈপরীত্য আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে। মুসলিম উম্মাহ্ যদি তাদের আদর্শিক ভিত্তির দিকে ফিরে তাকায়, ও ইসলামিক জীবন ব্যাবস্থাকে resume করার জন্য খিলাফত ব্যাবস্থাকে ফিরিয়ে আনে তবে তারা আবারও বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের পথে এগোতে পারে।
- তারিফুল ইসলাম
