খবরঃ
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেছেন, প্রতি বছর রাজস্ব আয় বাড়লেও জিডিপির তুলনায় তার পরিমাণ খুবই কম। আফ্রিকার দেশ উগান্ডার জিডিপির তুলনায় রাজস্বের হার সাড়ে ১২ শতাংশ। আমরা অনেক সময় উগান্ডাকে নিয়ে হাসাহাসি করে থাকি। কিন্তু জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণে আমাদের অবস্থান উগান্ডার চেয়েও খারাপ। (www.kalerkantho.com/online/business/2025/12/10/1617936)
মন্তব্যঃ
ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো আসলে কেন জরুরি? যত বেশি ট্যাক্স আদায় হবে তত বেশি নাগরিক সুবিধা পাওয়া যায়? ততবেশী সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়? বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি আমাদের কোন ইতিবাচক বার্তা দেয় নি। যেমন ফ্রান্সে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ৪৩.৮ শতাংশ কিন্তু ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন, পেনশন আন্দোলন ইত্যাদি মোটেও জনগণের পক্ষ থেকে ভালো থাকার কোন বার্তা দেয় না। একই ঘটনা গ্রিস (৪০%), ইতালি (৪০%), স্পেন (৩৭%), আর্জেন্টিনা (৩০%), ব্রাজিল (৩৩%), দক্ষিণ আফ্রিকা (২৭%), মিশর (২৭%) এসকল দেশে এত উচ্চ ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত থাকার পরেও বেকারত্ব, দারিদ্রতা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারা ইত্যাদি বিষয়গুলো স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে যে কি কারণে এনবিআরের চেয়ারম্যান এই ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতের বৃদ্ধির উপর এত জোর দিচ্ছেন!!!
কারণ দুটো: এক- এটাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামো এবং দুই-এটা নব্য উপনিবেশবাদি আধিপত্যের হাতিয়ার। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ট্রিকল ডাউন পলিসির কারণে পুঁজিপতিরাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে জনগণ থেকে আদায় করা ট্যাক্সের টাকা বিনিয়োগ করা হয়, তাদেরকে সুবিধা দিয়ে বিভিন্ন রকম আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে করে সমাজে জনবান্ধব প্রকল্পের বদলে সেইসব প্রকল্প নেয়া হয়, যা পুঁজিপতিবান্ধব। এতে করে অনেক ট্যাক্স আদায় হলেও পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোও তাদের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা শুধু নিজের রাষ্ট্রের মানুষকে বঞ্চিত করেই ক্ষান্ত হয় না। দ্বিতীয়ত, তারা নব্য-উপনিবশিক মডেল অনুযায়ী বাংলাদেশের মত সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলোতে তাদের পছন্দ করা দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতালোভী স্থানীয়দের ক্ষমতায় বসায় এবং লুটপাটের সুযোগ করে দেয়। এতে করে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল হয়। এই সুযোগে ঋণদাতা হিসেবে প্রবেশ ঘটে পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের তৈরি করা আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো। যাদের শর্ত থাকে ভর্তুকি কর্তন, জনগণের গলায় পাড়া দিয়ে ট্যাক্স আদায়, বেসরকারীকরণ নীতি (Public Private Partnership(PPP), Product Sharing Contract (PSC)) ইত্যাদি। বেসরকারিকরণ নীতির হাত ধরে দেশি খনিজ ও কৌশলগত সম্পদে বিদেশি কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়।
পুঁজিবাদী অর্থনীতির উদ্দেশ্যই থাকে কিভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে পুঁজিপতিদের ভালো থাকা নিশ্চিত করা যায়। অন্যদিকে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছ থেকে আসা ইসলামী জীবনব্যবস্থার অর্থনীতিতে তিনি যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সেটাকে প্রয়োগ করাই খলিফার দায়িত্ব। এখানে বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থার আধিপত্য মেনে নেয়ার প্রশ্নই আসে না। যেমন ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১) ব্যক্তিগত সম্পদ ২) রাষ্ট্রীয় সম্পদ ৩) গণমালিকানাধীন সম্পদ। তেল, গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ছাড়াও যে কোন ধরনের খনিজ পদার্থ, নদী, সমুদ্র, চারণভূমি গণমালিকানাধীন সম্পদ। এগুলো নিয়ে কুক্ষিগত করা বিদেশি রাষ্ট্র তো দূরের কথা রাষ্ট্রের কোন ব্যবসায়ীও এগুলো নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না। রাষ্ট্র এগুলোকে জনগণের ব্যবহারে আনার বা এগুলোর সুফল পাবার ব্যবস্থা করবে। এছাড়াও ইসলামি অর্থনীতি অন্যায়ভাবে জনগণের উপর কর আরোপ করে না। আল্লাহ্’র রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “অন্যায়ভাবে কর আরোপকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না”। রাষ্ট্রীয় ফান্ডের জন্য ইসলামের নির্দিষ্ট খাত আছে। যেমন কৃষি থেকে উৎপাদিত ফসলের উপর কর(উশর), বিজিত জমির উপর ভূমি কর(খারাজ) ইত্যাদি। উৎপাদিত সম্পদের উপর কর নির্ধারণ হবে, আয়ের উপর না। রাষ্ট্রের খুব প্রয়োজনে খলিফার নির্দেশে রাষ্ট্র ধণীদের উপর সাময়িক কর আরোপ করতে পারে। এভাবেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র দিকনির্দেশনায় ধণী-গরিব নির্বিশেষে সকলের জন্য সার্বিক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আনবে ইসলামী জীবনব্যবস্থা খিলাফত।
- জাবির জোহান
