৩২ ঘণ্টা পর উদ্ধার শিশু সাজিদ বেঁচে নেই

 


খবরঃ

রাজশাহীর তানোরে পরিত্যক্ত নলকূপের গভীর গর্তে পড়ে যাওয়ার ৩২ ঘণ্টা পর উদ্ধার শিশু সাজিদ (২) বেঁচে নেই। গতকাল বুধবার দুপুর ১টার দিকে পঞ্চন্দর ইউনিয়নের কোয়েল হাট পূর্ব পাড়া গ্রামের ওই গভীর খাদে পড়ে যায় শিশু সাজিদ। পুলিশ জানায়, গতকাল দুপুরের দিকে মাটি বোঝাই একটি ট্রলি হঠাৎ সেখানে দেবে যায়। এ ঘটনা দেখতে রুনা খাতুন তার ছেলে সাজিদকে নিয়ে মাঠে যান। হাঁটার সময় সাজিদ হঠাৎ 'মা' বলে চিৎকার করে ওঠে। তখন পেছনে ফিরে রুনা খাতুন বুঝতে পারেন ছেলে গর্তে পড়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর তিনি নিচ থেকে সাজিদের 'মা' ডাক শুনতে পান। (https://bangla.thedailystar.net/news/bangladesh/news-722216)

মন্তব্যঃ

শাসকের উদাসীনতার কারণে দেশ যেমন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে, তেমনিভাবে শাসকের উদাসীন মনোভাবের সুযোগ নিয়ে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী দেশকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে। জনগণকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে এবং চারপাশে সম্ভাব্য মৃত্যুর পরিবেশ তৈরীতে আমাদের শাসকরা সিদ্ধহস্ত! যেমন, গত জুলাইয়ে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় বৃষ্টির সময়ে ঢাকনাবিহীন নালায় পড়ে গিয়ে ফারিয়া তাসনিম নামক এক নারী মারা গেলে তিনদিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয় পার্শ্ববর্তী বিল থেকে। একইভাবে আমরা দেখি ২০২২ সালের আগস্টে উত্তরায় প্রাইভেট কারে ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। তৎকালীন উন্নয়নের গল্পের ভীড়েও এই সামান্য গার্ডার সরাতে হাসিনা সরকারের লেগেছিল সাড়ে তিন ঘন্টা! তাছাড়া গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের উপর থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে আবুল কালাম আজাদ নামক এক পথচারী ঘটনাস্থলেই রাষ্ট্রীয় খুনের শিকার হন। আর সাম্প্রতিক মাইলস্টোনের ঘটনাতো আমাদের চোখে এখনো ভেসে উঠে। রাষ্ট্রের জনগণের জীবনের প্রতি এই উদাসীনতার ছাপ আমরা সাধারণ জনগণের  মধ্যেও প্রভাবিত হতে দেখি। যেমন তানোরের সাজিদের মৃত্যু হয়েছে যেই সেমিডিপের বোরহোলে পড়ে সেই বোরহোলের মালিক এটিকে ভরাট না করে বরং উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

আমাদের সরকারগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ ধরনের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এথেকে উদ্ভূত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরণের অক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের উদ্ধার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা। যেমন মাইলস্টোন বিমান দূর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্যে নিকটবর্তী হাসপাতালগুলোতে কোনরকম বার্ন ইউনিট ছিল না, ফলে জরুরী ভিত্তিতে তাদের চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে সামান্য গার্ডার সরাতেও সময় লেগেছিল সাড়ে তিন ঘন্টা। ২০১৪ সালে শিশু জিহাদের লাশ উদ্ধারে সময় লাগে তেইশ ঘন্টা আর সাজিদের লাগল বত্রিশ ঘন্টা। দেশে যত তথাকথিত উন্নয়ন বাড়ে আমাদের লাশের সংখ্যাও বাড়ে, আর পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমাদের লাশ উদ্ধারের সময়।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের শাসকেরা আমাদের প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা প্রদর্শন করে কেন? কারণ যে মানবরচিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দিয়ে তারা আমাদের শাসন করে সেই ব্যবস্থাতেই আমাদের অবহেলার ব্যাপারটি অন্তর্নিহিত। এখানে উন্নয়নের সংজ্ঞায় বড় বড় রাস্তা তৈরীর কথা থাকলেও সেই রাস্তার ম্যানহোলের ঢাকনা থাকে না,  উন্নয়নের তালিকায় মেট্রোরেলের নাম থাকলেও মেট্রোরেলের বিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপনা নেই, উচু উচু ভবন নির্মাণ উন্নয়নের নির্দেশক হলেও ভবনগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধক কিনা বা অগ্নিনির্বাপনযোগ্য কিনা সেই ভাবনাকে উন্নয়নের পরিধির মধ্যে রাখা হয়নি। ফলে, উন্নয়ন হয় দৃশ্যমান কিন্তু তা সাধারণ জনগণের কোন উপকার বয়ে আনে না বরং অনেকক্ষেত্রেই বিপদ ডেকে আনে। এর পাশাপাশি, এই মানবরচিত সেক্যুলার ব্যবস্থায় শাসক তার শাসনের জন্য আল্লাহ্‌র (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কাছে নিজেকে দায়বদ্ধ মনে করে না, বরং তারা ভয় করে জনগণ রেগে গেল কিনা কিংবা তাদের পশ্চিমা প্রভুরা রুষ্ট হল কিনা। ফলে, এদের চিন্তা থাকে জনগণকে প্রতারণা কিংবা ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা। এবং অন্যদিকে দেশের কৌশলগত বিষয় যেমন বন্দর কিংবা তেল-গ্যাস ক্ষেত্র বিদেশীদের হাতে তুলে দিয়ে নিজেদের গদিকে ঠিক রাখা। ফলে, জনগণ গর্তে পড়ে মারা গেল নাকি আগুনে পুড়ে ছাই হল তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না। বরং তাদের দায়বদ্ধতা থাকে পুঁজিপতি এলিট শ্রেণীর প্রতি যারা দেশের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক এবং শাসক শ্রেণীর ত্রাণকর্তা। ফলে, গুলশান-বনানীর ব্যাপারে সরকার যতটা সিরিয়াস ঠিক ততটাই উদাসীন কড়াইল বস্তির ব্যাপারে। এই ব্যবস্থায় শাসক থাকেন ভদ্রপল্লিতে, রাজশাহীর তানোরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমরা যদি চাই আমাদের শাসক আমাদের প্রতি খেয়াল রাখুক আর আমাদের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখুক তাহলে যেই ব্যবস্থায় শাসকের এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান সেই ব্যবস্থা অর্থাৎ ইসলামী ব্যবস্থায় আমাদের প্রত্যাগমন করা উচিত। ইসলামী ব্যবস্থায় উন্নয়ন মানেই কেবল উচু উচু বিল্ডিং নির্মান নয় বরং নাগরিকদের প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে কিনা তার নিশ্চয়তা বিধান করা, প্রতিটি নাগরিক যথাযথ নাগরিক সেবা পাচ্ছে কিনা তার প্রতি সিরিয়াস মনোযোগ দেয়া। খলিফা উমার (রা.) যখন বলতেন, “ইরাকে যদি একটি খচ্চরও হোঁচট খায়, আমি আশঙ্কা করি আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, “হে উমার, তুমি কেন তার জন্য পথ মসৃণ করনি?”” তখন সেটি শুধুমাত্র কোন রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না বরং তা ছিল উন্নয়নের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জনগণের দেখভালের ব্যাপারে শাসকের মনোভাব কেমন হওয়া উচিত তার ইসলামী দর্শন। উপরন্তু শাসকের এই সিরিয়াস দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামী ব্যবস্থায় জনগণের মধ্যেও প্রভাবিত হয়। খলিফা উমরের সময়ে সেই গোয়ালিনী মহিলার ‘দুধে পানি না মেশানোর ঘটনা’ থেকে বুঝতে পারি শাসক যদি জনগণের ব্যাপারে সচেতন হয় তাহলে জনগণও তাদের নিজেদের ব্যাপারে সচেতন হবে।

    -    মো. হাফিজুর রহমান 


Previous Post Next Post