খবরঃ দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করছেন। ..পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সারা দেশের ‘আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর’ তথ্য উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনায় দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত—এই পাঁচ বছরে দেশে মোট ৭৩ হাজার ৫৯৭ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৪ হাজার ৭১৯ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। সেই হিসাবে দৈনিক ৪০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১২ হাজার ৩৩৫টি ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় একই (সামান্য বেশি, ৪১টি)। আশরাফুল ইসলাম বলেন, কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/oeaht3cp6d)
দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন এবং প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষের আত্মহত্যার এই গাঁ শিউরে উঠার খবর প্রমাণ করছে, আমাদের সামাজিক কাঠামো কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় উপনিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন দিন দিন আমাদের সামাজিক কাঠামো এমন ভঙ্গুর হয়ে উঠছে? কেন সমাজে মানসিক অবসাদগ্রস্থ রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমরা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারি, তাহলে দিনকে দিন এটি আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে।
যেকোন সমাজের মূল ভিত্তি গঠিত হয় উক্ত সমাজ মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা জীবনের যে মানে দিয়ে থাকে তার উপর। কেননা, এর উপর ভিত্তি করেই মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় জীবনকে কিভাবে পরিচালিত করবে। সেকুলারিজমের আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ সবসময় জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আসমানী কিতাবে তা খুঁজতো। সমাজ এবং মানুষের চিন্তাভাবনা সবসময় ধর্ম, ট্র্যাডিশন বা আধ্যাত্মিকতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। জীবন সম্পর্কে তখন মানুষের ধারণা ছিলো সুনিশ্চিত (Absolute)। যেমন- মুসলিমরা জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে তখন দৃঢ়ভাবে নিয়েছিল “আল্লাহ্’র ইবাদত করাকে’। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষ সে সময় জীবন সম্পর্কে সৃষ্টিকর্তার বক্তব্যের বা ধর্মীয় বিশ্বাসের দারস্ত হত। যা মানুষকে মানসিক অস্থিরতা থেকে অনেকাংশে মুক্ত রাখতো।
কিন্তু, সেক্যুলারিজমের আবির্ভাবের পরে পশ্চিমা বিশ্ব প্রি-মডার্ণ যুগের ধারণাকে ত্যাগ করে সৃষ্টিকর্তা বিবর্জিত নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, যাকে তারা মডার্ণ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯২৪ সালে খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের পর মুসলিমদের উপর এই সেক্যুলার ধারণাকে চাপিয়ে দেয়া হয়। তখন ধর্ম, বাস্তবতা, সৃষ্টিকর্তা কিংবা আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে বুদ্ধিজীবি ও রাজনীতিবিদদের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা ও জীবনবিধান হয়ে উঠে মূল ডমিন্যান্ট ফ্যাক্টর অথবা বলা যায় “The new god”। ফলে, জীবন সম্পর্কে সুনিশ্চিত (Absolute) ধারণা পরিবর্তিত হয়ে –হিউম্যান রিজনিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এবং ধীরে ধীরে মানুষ সৃষ্টিকর্তার পরিবর্তে পশ্চিমা দার্শনিকদের চোখে নিজেদের জীবনকে দেখা শুরু করে। যেমন জর্জ হেগেল (১৭৭০–১৮৩১) এর মতে জীবন মানে "আত্মার স্বাধীনতা এবং আত্ম-উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া"। জেরেমি বেন্থাম (১৭৪৮–১৮৩২ - উপযোগবাদীতার জনক) এর মতে “Maximize pleasure, minimize pain” (greatest happiness principle of modern era)। আর, জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬–১৮৭৩) এর মতে " জীবনে সর্বাধিক সুখ অর্জন করা (উপযোগবাদ) এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা”।
এক এক দিকভ্রান্ত পশ্চিমা দার্শনিকের এমন এক এক ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি জীবনকে নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে না নিয়ে উল্টো বিভ্রান্ত করে। তখন থেকেই মানুষের মাঝে জীবন সম্পর্কে বিভ্রান্তমূলক ধারণার প্রচলন শুরু হয়, যার ফলে মানুষ পূর্ববর্তী সময়ের মত জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিত (Absolute) ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। যা মানুষের মানসিক অস্থিরতাকে সমাধান না করে উল্টো বাড়িয়ে তুলে।
এটি আরো মহামারি আকার ধারণ করে যখন সেকুলার পশ্চিমা ও তাদের অনুসারীরা তথাকথিত মর্ডাণ দৃষ্টিভঙ্গির ট্রায়াল শেষ করে পোস্ট-মর্ডাণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা শুরু করে। এবার তারা মানুষ, জীবন, মহাবিশ্বের অস্বিত্ব এবং উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের আইডিয়া “প্রাসপেক্টিভিজম” নিয়ে আসে। যার মূল বক্তব্য হচ্ছে – কোন প্রকৃত সত্য বা Absolute Truth তথা জীবনের Absolute Meaning বলে কিছু নাই। এটি ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন। শরীরতত্ত্বীয় জেন্ডারের ধারণা থেকে যার যেটা ইচ্ছা সেই জেন্ডার নির্ধারণের ধারণা তার অন্যতম উদাহরণ। এই ধারণার অন্যতম প্রবর্তক ফ্রেডরিখ নিটশে এর মতে, ““God is dead”—we must create values and live as Übermensch (self-overcoming)” এবং জ্যাক ডেরিডা বলেন “Meaning is never fixed—always interpreted and reinterpreted”। এই পোস্ট-মর্ডার্ণ ধারণা মানুষের জীবনকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করেছে যে, মানুষ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যই হারিয়ে ফেলেছে। ফলে মানুষ এখন আর জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধানে কোন সুনিশ্চিত পথ খুঁজে পায় না। মানসিক অবসাদে বিভ্রান্ত হয়ে আত্মহননের দিকে ঝুঁকে যায়। যা পশ্চিমা দেশগুলোতে এখন মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই মহামারীর কালোছায়া এখন আমাদের মুসলিম সমাজগুলোর উপরও পড়ছে।
এভাবেই, জীবন সম্পর্কে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা আমাদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে ধ্বংস করছে। এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ প্রকৃত সত্য দ্বীন ইসলামের জীবন সম্পর্কে Absolute দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আর কি হতে পারে? এটিকে দ্রুততার সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে আঁকড়ে না ধরলে আমরা দেখবো এই সংখ্যা শুধু বেড়েই চলেছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “আর তিনি তোমাকে পেয়েছেন পথ না জানা অবস্থায়। অতঃপর তিনি পথনির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব। অতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন” (সূরা-দোহা-৭-৮)।
- আসাদুল্লাহ্ নাঈম