অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?

 


খবরঃ

দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার আগের জঞ্জাল সরিয়ে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত আনার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল চব্বিশের আন্দোলনের পর তা কতটুকু এগোল? সামনের দিনগুলোইবা কেমন যাবে? বছর শেষের হিসাবে বসলে এক কথায় বলা যায়, প্রত্যাশার যে ফানুস ডানা মেলেছিল তা খুব বেশি উড়তে পারেনি; আবার চুপসেও যায়নি একেবারে। এখন অপেক্ষা নির্বাচনের; সবার প্রত্যাশা ভালো একটি ভোটের পর নির্বাচিত সরকার এলে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার মেঘ কাটতে শুরু করবে। তৈরি হবে কর্মচাঞ্চল্য। ঝিমিয়ে পড়া সূচকগুলো চাঙা হতে শুরু করবে। এতে নতুন বছরে নতুন সরকারের হাতে একটি নতুন সূচনা হবে অর্থনীতির।(https://bangla.bdnews24.com/saltamami/saltamami2025/db89e12df3aa

মন্তব্যঃ

অসহনীয় মূল্যস্ফীতি, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন, ১১২ বিলিয়ন বৈদেশিক ঋণের বোঝা, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সংকট, রপ্তানি ও বিনিয়োগের স্থবিরতার চিত্র, উচ্চহারে ভ্যাট ও করের চাপ, দারিদ্রতা ও সংকুচিত কর্মসংস্থান সহ ২০২৫ সালে দেশের অর্থনীতি যে চরম দুঃসময় পার করেছে তা কোন নির্দিষ্ট বছরের উদ্ভুত সমস্যা নয়, বরং এগুলো বাংলাদেশ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। এদেশে ক্ষমতায় আসা প্রতিটি পুঁজিবাদী সরকার দেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে এই সমস্যাগুলি বর্তমানে এমন পাহাড়সম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অর্থনীতির কোন সুত্রই আর কাজে আসছে না বলে বিভিন্ন সাম্প্রতিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। 

অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল যাবতীয় অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্ত হওয়া এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে শাসক পরিবর্তিত হয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের চেহারা ও অর্থনৈতিক পলিসির কোন পরিবর্তন করেনি, বরং চলমান অর্থনৈতিক সংকটের দায়ভার হাসিনার দুর্নীতি ও অপশাসনের উপর চাপিয়ে দায়মুক্তির চেষ্টা করছে। অর্থনীতির কোন সুত্রই আর কাজে আসছে না বলে বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পরেও কতিপয় পশ্চিমাপন্থী গণমাধ্যম এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা  যুক্তি দিচ্ছে যে দেশে নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিই সকল সমস্যার মূল এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের শাসনভার নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হলে অর্থনীতির শুভ বছরের আগমন ঘটবে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসলেও অর্থনীতির শুভ বছরের আগমন ঘটা সম্ভব নয় কারণ সমস্যার মূলে কোনও ব্যক্তি বা সরকার নয়, বরং তারা যে ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসন করে, অর্থাৎ খোদ পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা নিজেই।

বিদ্যমান পুঁজিবাদী শাসন কাঠামোর ভেতরে নির্বাচিত সরকার আসলেও সে সরকার অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী নীতি ও প্রেস্ক্রিপশন ভিন্ন অন্যকিছুই বাস্তবায়ন করবে না। নতুন সরকারও সম্পদ বন্টনের পরিবর্তে পুঁজিবাদের Trickle Down অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুন্ঠন করে ক্ষুদ্র পুঁজিপতিগোষ্ঠীকে যাবতীয় সম্পদের সুবিধাভোগী করবে। ইচ্ছামত টাকা ছাপিয়ে বাজারে মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন ঘটাবে এবং ঋণখেলাপীদেরকে বেইল আউট করে তাদেরকে সমৃদ্ধ ও মোটাতাজা করবে। নব্য উপনিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নীতি অনুসারে নজিরবিহীন ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার সহ দেশের উদীয়মান শিল্প(চিনি, পাট, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি) ধ্বংসের মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে বেকার করা, বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) এবং  মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের বাজারকে বিদেশী শিল্প ও পণ্যের হটস্পটে পরিণত করবে। জ্বালানি খাত ও দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরসমূহ বেসরকারিকরণের নামে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া থেকে ক্ষান্ত হবে না। ডলার ভিত্তিক মুদ্রানীতি চালু রাখার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা টাকার বিপরীতে ডলারকে শক্তিশালী করবে যার ফলে দেশের জনগণ মূল্যস্ফীতির যাতাকলে পিষ্ঠ হতেই থাকবে। তাহলে আসন্ন নির্বাচনে যারা পদপ্রার্থী তারা কি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচার প্রচারণায় জনগণকে কিভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণ ও নিষ্পেষণ থেকে মুক্ত হবে সেই রুপরেখা দিচ্ছে? আগামীতে নির্বাচিত সরকারও যদি একই শোষণমূলক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই ফাংশন করে তাহলে তারা কিভাবে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে? তাদের মাধ্যমে কিভাবে অর্থনীতির শুভ বছরের আগমন ঘটবে? 

অর্থনীতির শুভ বছর নিয়ে আসতে পারে কেবল খিলাফতের অধীনে বাস্তবায়িত ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা পুঁজিবাদের একমাত্র বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ঘৃণ্য Trickle Down অর্থনৈতিক মডেলের বিপরীতে প্রতিটা নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা সহ সকল নাগরিকের মাঝে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করবে। ইসলামে নাগরিকদের আয় (যেমনঃ আয়কর) এবং ব্যায়ের (ভ্যাট) উপর কর আরোপ নিষিদ্ধ, যার ফলে জনজীবন স্বাছন্দ্যময় হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে দেশের অর্থনীতির যে জিম্মি দশা তা থেকে খিলাফত রাষ্ট্র বের হয়ে আসবে এবং দেশীয় শিল্পস্থাপন সহ ভারী শিল্পায়ন করে সার্বভৌম ও স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-জ্বালানী খাত ও কৌশলগত বন্দরসমূহকে বিদেশী পুঁজিবাদী কোম্পানীসমূহ থেকে উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আনা হবে। ফলে জ্বালানী সহজলভ্য হবে, শিল্পোৎপাদন খরচ ও পণ্যদ্রব্যের দাম কমা সহ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমে আসবে। খিলাফত রাষ্ট্রে সুদভিত্তিক ঋণ নির্ভর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মত কোন লুটপাটের থাকতে পারবে না। তাই ক্ষুদ্র পুঁজিপতিরা জনগণের অর্থ ঋণ হিসাবে গ্রহণ করে লুটপাটের কোন সুযোগ পাবে না। এছাড়া ইসলামের স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রয়েছে স্বর্ণ এবং রোপ্য ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা যে মুদ্রাব্যবস্থায় মুদ্রা ছাপানো হয় স্বর্ণ ও রৌপ্যের মজুদের ভিত্তিতে, তাই এই মুদ্রাব্যবস্থায় মুদ্রা সরবরাহজনিত মুদ্রাস্ফীতি বলে কিছু নেই। স্বর্ণ এবং রোপ্য ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা ডলার ভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে যার ফলে দেশের মুদ্রাব্যবস্থার উপর ডলারের অশুভ নিয়ন্ত্রণ নির্মূল হবে। সর্বোপরি এদেশের বিপুল জনশক্তি, কৌশলগত অবস্থান ও  সম্পদসমূহ ব্যবহার করে আসন্ন খিলাফত বিশ্বের বুকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। খিলাফত রাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়নের ফলে জনগণ সত্যিকারের ঐশ্বর্যময় জীবন অতিবাহিত করা শুরু যেমন করবে তেমনি আসমান ও যমীনও তাদের নিয়ামত এবং বরকরতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “আর যদি সে সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম….” [আল-আ'রাফ, ৯৬]

    -    কাজী তাহসিন রশীদ


Previous Post Next Post