খবরঃ
২০২৫ সাল জুড়ে ‘মব সন্ত্রাস’ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো ধরনের প্রমাণ, তদন্ত বা আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, সন্দেহ, গুজব সৃষ্টি করে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে। ‘তওহীদি জনতা’র নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধ মতের মানুষকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে, যা দেশে আইনের শাসনের জন্য চূড়ান্ত হুমকিস্বরূপ এবং সমাজে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ সব কথা বলা হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮ জন। (https://www.jugantor.com/national/1047140)
মন্তব্যঃ
পতিত যালিম হাসিনা সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে সাজিয়ে ছিল যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে সেবা প্রদান না করে, হয়ে উঠেছিল জুলুমের হাতিয়ার। যে কারণে জনগণ সামষ্টিকগতভাবে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। দেশের অন্যতম প্রাচীন সেকুলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভূমিধস পতন হয়। হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রকে তাদের মনে করা শুরু করেছিল। রাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলোকে স্বেচ্ছা শ্রমের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করা শুরু করেছিল। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ পুলিশশূন্য নগরী, ট্রাফিকের দায়িত্বে ছাত্র-জনতা, জাগো নিউজ, ০৬ আগস্ট ২০২৪)। রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের এই সমর্থনকে তার বৈধতা অর্জনের সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করে জনগণকে এই ধরনের কাজে উৎসাহ দেয়া শুরু করে। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ মব না, এটি প্রেসার গ্রুপ: প্রেস সচিব, বাংলা ট্রিবিউন, ২৬ জুন ২০২৫)। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা তাদের ব্যাক্তিগত ও গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিল করার জন্য মব করা শুরু করে। এই রকম অসংখ্য ঘটনা জাতীয় সংবাদ মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। এমনকি, এই মুহূর্তে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যাপক সোচ্চার বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও ‘মব সন্ত্রাস‘ করার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে হেনস্তা তার একটি উদাহরণ মাত্র। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ 'মব সন্ত্রাসে' বিএনপিও নিজেকে জড়ালো কেন, বিবিসি বাংলা, ২৩ জুন ২০২৫)।
কিন্তু, সমস্যার শুরু যখন জনগণের ঈমান-আক্বীদার উপর আক্রমন, সরকার কর্তৃক উপনিবেশবাদীদের স্বার্থ রক্ষা, এবং সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলোর চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন প্রকার অন্যায়ের প্রতিবাদ শুরু হয়। যেমন: জনগণের চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যাকারী আরকান আর্মিকে তথাকথিত ‘মানবিক করিডোর‘ প্রদান করতে পারে নাই। আবার, সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের এই সামষ্টিক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তাদের রাজনীতির জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা শুরু করে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার, সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো এবং উপনিবেশবাদীদের মিডিয়া (যেমনঃ ব্রিটিশ সরকারের বিবিসি, ভারতের আনন্দবাজার) জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে নষ্ট করার জন্য বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারা তথাকথিত মবকে ইসলামের সাথে ট্যাগিং করে দক্ষিণ পন্থার উন্থান, মবক্রেসিসহ নানা ভীতিকর শব্দ ব্যবহার করে জনগণকে কল্পিত ভীতি প্রদর্শন করে ব্যার্থ সেকুলার রাজনীতিকে ন্যায্যতা দিতে চাচ্ছে।
যদিও, ইসলামের সাথে মব সন্ত্রাসের কোন সম্পর্ক নাই। কোন নিষ্ঠাবান মুসলিম মব করার মাধ্যমে কারও প্রতি কোন অন্যায় করতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, ”…যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল।…” (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ৩২)। সুতরাং, মব সন্ত্রাসের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। বরং, মব সহিংসতার মূল দায় জনগণের স্বার্থ বিরোধী সেকুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং রাজনীতি। আসকসহ তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থাগুলো যদি সত্যিই মব সহিংসতার সমাধান চায় তাহলে তাদের উচিত ত্রুটিপূর্ণ সেকুলার রাজনীতি প্রত্যাখান এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুসন্ধান করা।
খিলাফতের ১৩০০ বছর ইতিহাসে মব সন্ত্রাস ছিল বিরল। খিলাফত কিভাবে জনগণের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে তথাকথিত মব জাস্টিস না করে শারীয়ার (আইনের) শাসন প্রতিষ্ঠাত করতো তা বোঝোর জন্য অসংখ্যা ঘটনা থেকে একটি উদাহরণ উপস্থাপন করছি: “খলিফা উমর ফারুক (রাঃ)’র খেলাফতকাল মিসরের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ)। সে সময় একদিন আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রীষ্টান পল্লীতে হৈচৈ পড়ে গেলো। কেউ একজন যিশু খ্রীষ্টের প্রস্তরনির্মিত মূর্তির নাক ভেঙ্গে ফেলছে। খ্রীষ্টানদের সন্দেহের তীর মুসলিমদের দিকে। তারা উত্তেজিত হয়ে উঠলো। খ্রীষ্টান বিশপ অভিযোগ নিয়ে শাসনকর্তা আমর ইবনুল আস এর কাছে আসলেন। আমর ঘটনা শুনে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি ক্ষতিপূরণ স্বরূপ মূর্তিটি নতুনভাবে তৈরি করে দিতে চাইলেন। কিন্তু খ্রীষ্টান নেতাদের প্রতিশোধ স্পৃহা ছিলো অন্যরকম। তারা চাইলো মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মূর্তি তৈরি করে অনুরূপভাবে নাক ভেঙ্গে দিতে। খ্রীষ্টানদের এ মতামত ব্যক্ত করার মধ্যে দিয়ে যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়েছে, তাতে তাদের কতটুকু বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যে নবী (সাঃ) আজীবন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, সে নবীর মূর্তি তৈরীকে মুসলিমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারল না। হযরত আমর কিছুক্ষণ নীরব থেকে খ্রীষ্টান বিশপকে বললেন, ‘আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যে কোন প্রস্তাব করুন, তা বাস্তবায়নে আমি রাজি আছি। আমাদের যে কোন একজনের নাক কেটে আমি আপনাদের দিতে প্রস্তুত, যার নাক আপনারা চান।’ খ্রীষ্টান নেতারা সকলে এ প্রস্তাবে সম্মত হলো। পরদিন খ্রীষ্টান ও মুসলিমরা বিরাট এক ময়দানে একত্রিত হলো। মিসরের শাসক সেনাপতি আমর (রাঃ) সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বললেন, ‘এদেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের, তাতে আমার শাসনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। তাই তরবারী গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাসিকা ছেদন করুন।’ একথা বলেই তিনি বিশপকে একখানি তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারী হাতে দিলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রীষ্টানরা স্তম্বিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সে নীরবতায় নিঃশ্বাসের শব্দ করতেও যেন ভয় হয়। সহসা সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মুসলিম সৈন্য এগিয়ে এলো। চিৎকার করে বললো, ‘আমিই দোষী, আমীরের কোন দোষ নেই। আমিই মূর্তির নাক ভেঙ্গেছি, তা আমার হাতেই আছে। তবে মূর্তি ভাঙ্গার কোন ইচ্ছা আমার ছিলোনা। মূর্তির মাথায় বসা একটি পাখির দিকে তীর নিক্ষেপ করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’ সৈন্যটি এগিয়ে এসে বিশপের তরবারীর নিচে নিজের নাসিকা পেতে দিলো। নির্বাক সকলে! বিশপের অন্তরাত্মা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো। তরবারী ছুড়ে দিয়ে বিশপ বললেন, ‘ধন্য শাসক, ধন্য এই বীর সৈনিক, আর ধন্য আপনাদের মুহাম্মদ (সা:), যাঁর মহান আদর্শে আপনাদের মতো মহৎ উদার নির্ভিক ও শক্তিমান ব্যক্তি গড়ে উঠেছে”।
- মো: সিরাজুল ইসলাম
