খবরঃ
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী। শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় বড় আকারের হামলা চালানোর পর মাদুরোকে আটক করার এই ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেলটা ফোর্স ধরে নিয়ে গেছে। (https://www.banglatribune.com/foreign/america/928730/ভেনেজুয়েলায়-মার্কিন-হামলার-পর-মাদুরো-আটক-ট্রাম্প)
মন্তব্যঃ
আমেরিকা খিলাফতের উত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আরব বিশ্বের তেলের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে ভীত। কিছুদিন পূর্বে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড এবং অতি সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কর্তৃক আসন্ন খিলাফত রাষ্ট্রকে পশ্চিমা বিশ্ব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘হুমকি’ হিসাবে বক্তব্য প্রদান, মুসলিম বিশ্বের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কার ইঙ্গিত বহন করে। এ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা দেখলাম পরেই একক দেশ হিসেবে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ খনিজ তেল মজুদের (বিশ্বের ১৮%) দেশ ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করে সেদেশের প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ ও আমেরিকার তেল কোম্পানীগুলো ভেনেজুয়েলায় ব্যাপকভাবে তেল উত্তোলনের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত ‘Trump Corollary’ নীতিতে বলা হয়— “পশ্চিম গোলার্ধের (উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকার) রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্র অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে এবং এই অঞ্চলের খনিজ সম্পদ আহরণে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সরাসরি ব্যবহার করা হবে”। এই ‘Trump Corollary’হল ১৮ শতকের ‘Monroe Doctrine’ এর আধুনিক সংস্করণ যেসময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা মহাদেশের একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ছিল এবং আটলান্টিকের এপারে এসে প্রভাব বিস্তারের কথা কল্পনাও করতে পারত না। সেই পুরনো নীতিকে পূনরায় চালু সুষ্পষ্টভাবেই আমেরিকার ‘খিলাফত ভীতি’ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা এবং এর বিপরীতে সম্ভাব্য সর্বোত্তম ও বাস্তবসম্মত বিকল্প (Contingency) অনুসন্ধানের সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। আমেরিকা স্পষ্টতই ধরে নিয়েছে খিলাফতের উত্থান ঠেকানো এখন একটি ‘অসম্ভব’ বিষয়!
মাদুরো অপহরণ ঘটনায় মার্কিন সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী ও অজেয় মনে করার কোন কারণ নেই। ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর সম্মতি, সহায়তা ও নিক্রিয় থাকার প্রতিশ্রুতি ছাড়া মার্কিন বাহিনী কখনোই এই ধরনের আত্মঘাতি অভিযান পরিচালনা করে জীবিত ফেরত আসতে পারত না। আমেরিকার উস্কানীতে ২০০২ সালে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের বিরুদ্ধে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পরও অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী জেনারেলরা চাকুরীতে বহাল তবিয়তে থাকার ‘অদ্ভুত’ ঘটনা প্রমাণ করে সেদেশের সেনাবাহিনীর উপর আমেরিকা কতটা প্রভাব রাখে। এই প্রভাবের কারণেই কিউবান সরকারী বাহিনীর সদস্যদেরকে দিয়ে মাদুরো তার বাসভবন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষা করত। আমেরিকা ইতিপূর্বে একই ধরনের বোঝাপড়ার সামরিক অভিযানে পাকিস্তানী ভূখন্ডে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রতিরোধের মুখে পরলে কি হয় তার জন্য ইরাক আক্রমণের পর ২০০৪ সালে সংঘটিত ফাল্লুজার দ্বিতীয় যুদ্ধকে স্মরণ করাই যথেষ্ঠ। ১০,৫০০ মার্কিন সৈন্যের পুরো একটি ডিভিশন ও ৮৫০ বৃটিশ সৈন্যের একটি পূর্ণ ব্যাটালিয়নের সাঁজোয়া বহর নিয়ে ইরাকের ফাল্লুজা দখল করতে গিয়ে ৯৫ জন আমেরিকান ও ৪ জন বৃটিশ সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। স্থল ও আকাশপথে আক্রমণ করে মাত্র ২,৬০০ জন ইরাকী প্রতিরোধ যোদ্ধাকে পরাজিত করতে আমেরিকার লেগেছিল দীর্ঘ ৪৫ দিন। এর আগে ১৯৯৩ সালে সোমলিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে আক্রমণ করতে গিয়ে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের (ডেল্টা) ১৮ সৈন্য নিহত ও দুটি ব্ল্যাক হওক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর রাতের অন্ধকারে ‘দু্র্বল’ দেশ সোমালিয়া ছেড়ে পালিয়েছিল অপরাজেয় (!) আমেরিকান বাহিনী। অথচ, অন্তত ১ লক্ষ ভেনেজুয়েলান সেনা ও ২ লক্ষের অধিক প্যারামিলিটারির নাকের ডগা দিয়ে যখন সেদেশের প্রেসিডেন্টকে তার সরকারী বাসভবন থেকে আমেরিকা কোন প্রাণহানী ছাড়াই তুলে নিয়ে যায়, তখন অসংখ্য প্রশ্ন থেকেই যায়।
মাদুরোকে সন্ত্রাসবাদী কায়দায় অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে মার্কিন সরকার মূলত তথাকথিত “সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের” ধারণার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া (funeral) সম্পন্ন করেছে। সুতরাং, বাংলাদেশের মুসলিম জনসাধারণ, রাজনীতিবিদ ও প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গের উচিত এই ‘সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের’ কল্পকাহিনীমূলক ও প্রতারণামূলক ধারণাকে মহিমান্বিত করার মত বোকামিকে এই মূহূর্তে পরিত্যাগ করা। তাদের কর্তব্য হল মানব ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষনের অংশ ও স্বাক্ষী হতে আসন্ন খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করা, যে রাষ্ট্র সকল সন্ত্রাসবাদকে মোকাবেলা করে ন্যায়ের সার্বজনীন ঐশী পতাকাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে।
- রিসাত আহমেদ
