সরকার সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর

 


খবরঃ 

বিএনপি সরকার সব ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেটে ভেঙে দিতে বদ্ধ পরিকর বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে রাষ্ট্র এবং সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সবক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সকল সিন্ডিকেটে ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর। আজ বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানের এটিই জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ। (https://samakal.com/bangladesh/article/339238/সরকার-সব-সিন্ডিকেট-ভেঙে-দিতে-বদ্ধপরিকর

মন্তব্যঃ 

মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটানোর অঙ্গীকারের পাশাপাশি সিন্ডিকেটকে কার্যকরভাবে ভেঙে দিতে সিন্ডিকেট তৈরির মূল কাঠামো চিহ্নিত করা জরুরী। এই অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা তাদের উপনিবেশিক স্বার্থে কাঠামোগতভাবে এই অঞ্চলে সিন্ডিকেটের জন্ম দিয়েছে। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণ্যিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেয়া শুরু করে। ব্রিটিশরা তাদের দেশীয় এজেন্টদের (গোমস্তা) মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার সিন্ডিকেট তৈরি করে। তারা সাধারণ মানুষকে কম দামে চাল বিক্রি করতে বাধ্য করে। তারপর গুদামজাতকরণ (Hoarding) করে তার কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি করে। এই খাদ্য সংকটের ফলে ১৭৭০ সাল একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক তথ্য ও তৎকালীন ব্রিটিশ নথিপত্র অনুযায়ী এই দুর্ভিক্ষে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা) মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) মানুষ (প্রায় ১ কোটি) মৃত্যুবরণ করে। ‍কিন্তু, ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পরেও এই অঞ্চলের উপর থেকে উপনিবেশবাদীদের আধিপত্য চলে যায় নাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্ম লাভের পরে ১৯৮০-র দশকে নব্য উপনিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এই দেশের অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য চাপিয়ে দেয় স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SAP)। SAP-এর আওতায় তথাকথিত সংস্কারের নামে বিদেশী পণ্যের উপর শুল্ক এবং কৃষি উপকরণ যেমন—সার, বীজ ও সেচযন্ত্রে ভর্তুকি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করা শুরু করে। দেশীয় উৎপাদন হয়ে উঠে ব্যায়বহুল। যার ফলে, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার অনেকাংশে হয়ে উঠে আমদানি নির্ভর। আমদানি থেকে পণ্য বাজারে আসার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে অপব্যবহার করে জন্ম নয় ব্রিটিশদের আদলে নতুন সিন্ডিকেট। তারা আমদানি প্রক্রিয়ায় নিত্যনতুন কৌশল প্রয়োগ করে বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি করে। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ পানিতে সহস্রাধিক ‘ভাসমান গুদাম’, বন্দরে জাহাজজট, জাগো নিউজ২৪.কম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬)। তাই, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বাজারের সিন্ডিকেটে ভাঙতে হলে আমদানিনির্ভর উপনিবেশবাদী পলিসি এবং কাঠামোকে ভেঙে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

উপনিবেশবাদী কাঠামোর বাহিরে গিয়ে সিন্ডিকেটকে চিরতরে ভেঙে দিতে সরকার নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিতঃ 

১. দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নব্য উপনিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র যেমনঃ আমেরিকা, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদি রাষ্ট্র যেমনঃ ভারতের সাথে করা সকল প্রকার আধিপত্যবাদী প্রকাশ্য এবং গোপন চুক্তি বাতিল করা। প্রকৃতপক্ষে, আধিপত্যবাদী এই চুক্তিগুলো দেশীয় উৎপাদন, জনকল্যাণের জন্য বাধা কিন্তু সিন্ডিকেট তৈরির জন্য সহায়ক। 

২. ইসলামি ভূমি ব্যবস্থাপনার নীতি বাস্তাবায়নের মাধ্যেমে আবাদযোগ্য অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় নিয়ে আসা এবং অনাবাদি জমি উৎপাদনমূলক খাতে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করা। (জমি তিন বছর অনাবাদি থাকলে মালিকানা রহিত হয়ে যায়।) এই পলিসির অনুপস্থিতির কারণে দেশে আবাদযোগ্য জমির প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৫৫১ একর চাষাবাদে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এই বিপুল পরিমাণ জমি চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। 

৩. ইসলামী করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যেমে আমদনি প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ, এবং কম ব্যায় বহুল করা যাতে সকল শ্রেণীর ব্যাবসায়ীরা কোন প্রকার বাধা ব্যাতিরেকে বাজারের চাহিদার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পণ্য ন্যায্যমূল্যে আমদানি করতে পারে।

৪. ইসলামী মজুত আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবৈধ মজুতদারি বন্ধ করে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। শারীয়ার প্রয়োজন ছাড়া ৪০ দিনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত রাখা নিষিদ্ধ। 

এই নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একজন অভিভাবক যিনি মুসলিম উম্মাহ্‌’র প্রয়োজন পূরণের জন্য দায়িত্বশীল। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন, "নিশ্চয়ই ইমাম (খলিফা) হচ্ছেন অভিভাবক এবং তিনি তার নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল” (সহীহ্‌ বুখারী/মুসলিম)। যদি কখনো কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে বাজার সংকট তৈরি হয়, তখন শাসক হিসেবে খলিফার দায়িত্ব বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করে সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ বন্ধ করা। ইতিহাসের অসংখ্য উদাহরণ থেকে একটি উদাহরণ উপস্থাপন করছি খিলাফত কিভাবে সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগকে বাধা দিতেন। হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন তিনি সিন্ডিকেট দমনে কেবল কঠোর আইনই প্রয়োগ করেননি, বরং মিশর ও সিরিয়া থেকে বিশাল কাফেলায় খাদ্য আনিয়ে সরাসরি মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এতে মজুতদারদের হাতে থাকা পণ্যের দাম কমে যেতে বাধ্য হয়েছিল। নিশ্চয়, বরকমময় খিলাফতের ছায়াতলে সিন্ডিকেট চিরতরে বিলুপ্ত হবে। ”আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমীন থেকে বরকতসমূহ তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতাম” আল-আ'রাফ, আয়াত ৯৬

    -    মো: সিরাজুল ইসলাম


Previous Post Next Post