খবর:
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকার বলছে, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে ও শুল্ক কিছুটা কমবে। তবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি মোট ১৭৯ বার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩১ বারই ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মানে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য থাকবে.. (https://bangla.thedailystar.net/analysis/news-3925466)
মন্তব্য:
ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই তারা নবাবদের বাধ্য করতো এদেশীয় পণ্যের উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে ব্রিটেনে উৎপাদিত পণ্য কিনতে, যাতে স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। এভাবে বাংলার বিশ্ববিখ্যাত বস্ত্রশিল্প পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাংলাদেশ-মার্কিন ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ মূলত এমন এক কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে চুক্তির ধারাগুলো বাংলাদেশকে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কিনতে। যার তালিকায় রয়েছে ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ১৪টি বোয়িং বিমান এবং ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য। আর যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবাঞ্ছিত’ তালিকার কোনো দেশের (যাকে আমেরিকা ‘নন মার্কেট ইকোনমি’ বলে চিহ্নিত করে, অর্থাৎ চীন বা রাশিয়ার মতো) সঙ্গে চুক্তি করতে চায়, তাহলে আমেরিকা সঙ্গে সঙ্গেই এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপের হুমকি দিতে পারবে।
এটা একেবারেই বৃটিশদের সেই ‘বাধ্যতামূলক ক্রয়’ কৌশলের আধুনিক রূপ। ব্রিটিশরা যেমন নবাবদের বলতো ‘আমাদের কাছ থেকে কাপড় কিনো, নিজের তাঁত বন্ধ করো’, এখন আমেরিকা বলছে ‘আমাদের কাছ থেকে এলএনজি ও বোয়িং কিনো, অন্য কোথাও থেকে কিনতে চাইলে শুল্ক বাড়িয়ে দেবো’। অর্থাৎ, কী কিনবে, কার কাছ থেকে কিনবে, আর কার সাথে কোন লেনদেনই করতে পারবে না - এই সবগুলোই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাব ও শাসকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নির্ধারণ করে দিতো- নবাবরা কার সঙ্গে মিত্রতা করবে, কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। সবচেয়ে সুপরিচিত উদাহরণ ছিলো ‘অধীনস্থ মিত্রতা’ (Subsidiary Alliance) নীতি, যা ১৭৯৮ সালে প্রবর্তিত হয়। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো নবাবকে বাধ্য করা হতো যাতে সে নিজের নবাবীর ভেতরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে রাখে এবং সেই সেনাবাহিনীর খরচ বহন করে। বিনিময়ে ব্রিটিশরা তাকে ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিত। প্রকৃতপক্ষে এমন শর্তের আড়ালে উদ্দেশ্য থাকতো - নবাব নিজের সেনাবাহিনী ভেঙে দিবেন, পররাষ্ট্রনীতি ব্রিটিশদের হাতে ছেড়ে দিবেন এবং কোনো ইউরোপীয়কে চাকরিতে নেওয়ার আগে ব্রিটিশদের অনুমতি নেবেন। অর্থাৎ, ‘কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে এবং কার সঙ্গে রাখবে না’ - সেটা ব্রিটিশরাই ঠিক করত। হায়দ্রাবাদের নিজাম (১৭৯৮) এবং আওধের নবাব (১৮০১) এই নীতির শিকার হয়েছিলেন। আওধের নবাবকে সেনা খরচ বাবদ অর্ধেক রাজ্য (এলাহাবাদ ও ফতেহপুর) ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
পুরো চুক্তিজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে - শর্ত না মানলে চুক্তি বাতিল করা হবে এবং আগের আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আবার কার্যকর করা হবে। ফলে এটিকে শুধু বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ কম; বরং এটি বাংলাদেশের নীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা। প্রথম চাপটি এসেছে ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় - এমন কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না, যদি না আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। দ্বিতীয় চাপটি আরও সরাসরি, তথাকথিত “নন-মার্কেট ইকোনমি” বা অবাজার অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ এমন কোনো চুক্তি করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সমঝোতাকে দুর্বল করতে পারে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিলের অধিকার রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, বেলারুশসহ একাধিক দেশ রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ কার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলবে, সেই সিদ্ধান্তেও ওয়াশিংটনের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হবে। চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশগুলোর একটি হচ্ছে পারমাণবিক খাত। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যাকে যুক্তরাষ্ট্র তার গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে।
এই সামগ্রিক চুক্তি দেশে কেমন সর্বনাশ ডেকে আনবে তা সুস্পষ্ট। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কেন দেশের সরকার এবং নবীন-প্রবীণদের বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব এমন মারণঘাতি চুক্তি বরণ করে নিলো? উত্তর সুস্পষ্ট, আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক দাসত্ব। গত শতাব্দীর ২০ এর দশকে খিলাফতের পতনের পর থেকে বিশ্বে কোথাও প্রকৃত কোনো আদর্শিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেনি - যা নিজেকে পশ্চিমা দাসত্ব থেকে রাজনৈতিকভাবে মুক্ত করবে। শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থারই আছে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, যা আমাদেরকে এই দাসত্বের শিকল থেকে মুক্ত করবে।
এরকম সুবর্ণ সুযোগ থাকার পরেও যারা এই চুক্তি সরাসরি বাতিলের পরিবর্তে পর্যালোচনার ডাক দেয়, তারা কী আমাদেরকে আবার সেই বর্বর ব্রিটিশ শাসনের জুলুমে ফিরিয়ে নিতে চায়?!
- জুলফি আবেদ
