ডুবে যাওয়া ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারে গ্রিসকে অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ



খবর:

পুরো ইউরোজোনকে নাড়িয়ে দেয়া এক সংকটে গ্রিসের প্রায় সব ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। এক সংস্কার কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো। গ্রিস সরকার ও ইউরোপীয় তহবিল থেকে এ অর্থের জোগান দেয়া হয়। অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পথ খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ গ্রিস মডেল অনুসরণ করতে পারে বলে প্রতিবেদক তুলে ধরেন। (https://bonikbarta.com/bangladesh/2ZQo8M84LJf04f4a)

মন্তব্য:

২০০৮ সালের পর ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ে পতিত গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) ও আইএমএফের সহযোগিতায় ‘হারকিউলিস’ স্কিমের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে দেয়। একটি কৃত্রিম অর্থনৈতিক বাবল ফেটে পড়ার উপক্রম হলে বেইল আউটের মাধ্যমে ‘হিসাব পরিচ্ছন্ন’ করে সেটাকে বাঁচানোর চেষ্টা গ্রিসেই একমাত্র ঘটেছে তা নয়। ঋণনির্ভর অর্থনীতির কারণে এমন ব্যাংকিং বাবল তৈরির ঘটনা অনেক আছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবপ্রাইম মর্টগেজ সংকট, ১৯৯০-এর দশকে জাপানের “অ্যাসেট বাবল”, ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট, এমনকি আইসল্যান্ডের ব্যাংক ধ্বস - সবক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা গেছে। উপরে (তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে) কৃত্রিম সম্পদ (তথা ফিয়াট মুদ্রা) তৈরি করে ঋণ হিসেবে সুদ যুক্ত করে বাজারে ছেড়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের এই ব্যবস্থার ফল মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের লাগামহীন সম্প্রসারণ যা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়াত্বের মুখে ঠেলে দেয়। পরে পুরো ব্যবস্থাকে ফেটে পড়া থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় বেইল আউটের মাধ্যমে বড় ঋণগ্রহীতা ও আর্থিক গোষ্ঠীগুলোকে রক্ষা করা হয়।

কিন্তু এসব বেইল আউটের প্রকৃত মূল্য কে পরিশোধ করে? সাধারণ মানুষ। কারণ বেইল আউটের অর্থ আসে জনগণের কর, বিদেশী ঋণ, কিংবা আবার নতুন টাকা ছাপানোর মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন মুদ্রাস্ফীতি থেকে। বড় কর্পোরেট গোষ্ঠী ও ব্যাংক মালিকরা তাদের দায়মুক্তি পায়, অথচ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং দারিদ্রতা বাড়তে থাকে। গ্রিসে বেইল আউটের পর জনগণকে কঠোর মিতব্যয়ী নীতির (austerity) বোঝা বহন করতে হয়েছে - পেনশন কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে, সরকারি ব্যয় সংকুচিত হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতকে বাঁচানো হলেও জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।

এখানে বাংলাদেশ ও গ্রিসের বাস্তবতার পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিস ইউরোজোনের সদস্য হওয়ায় ইউরো মুদ্রা এবং ইউরোপীয় আর্থিক ব্যবস্থার সহায়তা পেয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো ডলার ও ইউরোর মতো বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ফিয়াট সম্পদ তৈরি করতে পারে এবং সেই মুদ্রাস্ফীতির বোঝা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের টাকার সে সক্ষমতা নেই। আমাদের ক্ষেত্রে বিদেশী ঋণ মানেই আইএমএফ কিংবা বিশ্বব্যাংকের জনস্বার্থবিরোধী শর্তসমূহ বাস্তবায়ন। যা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতাকে আরও সীমিত করে। তাই, সমস্যার মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে শুধু “গ্রিস মডেল” আমদানি করা প্রকৃত সমাধানতো নয়ই বরং এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব।

মূল সমস্যা হচ্ছে ব্যবস্থাগত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ঋণকে সুদ যুক্ত করে প্রবৃদ্ধির প্রধান ইঞ্জিন বানানো হয়। এই ইঞ্জিন ধীরে ধীরে সম্পদ উপরের ক্ষুদ্র এলিট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে। “ট্রিকল ডাউন” প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে “বটম আপ সাকিং সিস্টেমে” পরিণত হয়। যখন এই কৃত্রিম অন্যায্য বাবল ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয় তখন আবার বেইল আউটের মাধ্যমে নতুন ঋণচক্র সৃষ্টি করা হয়। সুতরাং, প্রকৃত অর্থে গ্রিস বা পশ্চিমা ব্যবস্থা সমাধানের উৎস নয় বরং সমস্যার উৎস। ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখানে একটি বিকল্প কাঠামো উপস্থাপন করে, যেখানে ফিয়াট মুদ্রা ও সুদ নিষিদ্ধ, অযৌক্তিক সম্পদ অব্যবহৃত রাখা নিরুৎসাহিত এবং ব্যবস্থাগতভাবে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ইত্যাদি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মত প্রবৃদ্ধির কৃত্রিম ও অন্যায্য সাকশন ইঞ্জিন বসিয়ে অর্থনীতি চালানো নয়। বরং ইসলাম প্রতিটি নাগরিককে দায়িত্বশীল করে এবং শাসক এই নাগরিকদেরকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলে ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে, ফলে প্রতিটি ব্যক্তি হয়ে উঠে মৌলিক অর্থনৈতিক একটর বা ইঞ্জিন। যা বাবল অর্থনীতি নয় একটি প্রকৃত অর্থনীতি তৈরি করে। হিযবুত তাহ্‌রীর প্রণীত কুর‘আন-সুন্নাহ্‌ ভিত্তিক খসড়া সংবিধানের ধারা ১৫৩ অনুযায়ী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। এছাড়া ইসলাম ব্যবস্থাগতভাবে সম্পদের প্রবাহ নিশ্চিত করে কারণ আল্লাহ্‌ সুবাহানাহু তাআলা বলেন, “…যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে…” (সূরা হাশর : ৭)।

    -    মোহাম্মদ তালহা হোসেন 

Previous Post Next Post