প্রার্থীদের ‘রহস্যজনকভাবে’ হার ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন জামায়াতের


খবরঃ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে করা পোস্টে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পোস্টে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল তৈরি ও ঘোষণার ধরণ জামায়াতের কাছে পরিষ্কার নয়। অনেক জায়গায় দলটির প্রার্থীরা অল্প ভোটের ব্যবধানে রহস্যজনকভাবে হেরে গেছেন। ফলাফলে বারবার গরমিল ও সাজানো মনে হয়েছে জামায়াতের। প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি বলে দাবি করেছে দলটি। (https://www.dailyamardesh.com/politics/jamaat/amdxuaj3vjcpl)

মন্তব্য:

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পর ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে কম্প্রোমাইজ (compromise) করে ধীরে ধীরে (gradualism এর ভিত্তিতে) ইসলাম বাস্তবায়নের চিন্তাটি নিয়ে ইসলামপন্থী দলগুলোর নতুন করে ভেবে দেখা উচিত। আমাদের জানা জরুরী, গণতন্ত্র নামের এই ব্যবস্থাটি কী? এটি শুধু “ভোট” দেয়া ও নেয়ার যন্ত্র নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন। এর মূলে রয়েছে সার্বভৌমত্ব মানুষের, আইনের উৎস মানুষের ইচ্ছা, এবং আইনের চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। কোনো দল যদি বলে, ‘আমরা এই ব্যবস্থার ভেতর থেকে কাজ করে একদিন এর মৌল নীতিগুলোই বদলে দিয়ে আল্লাহ্‌’র সার্বভৌমত্ব কায়েম করব,’ - তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এবং এর রক্ষকরা কি সত্যিই তা হতে দেবে?

ধর্মনিরপেক্ষ-ণণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষক ও প্রবর্তক পশ্চিমা বিশ্ব, কখনোই ইসলামপন্থীদের এই ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর থেকে তাদের নিজেদের ভিত্তিমূলকে উৎখাত করতে দেবে না। বরং তারা নানাবিধ চাপ, কৌশল ও শর্তারোপের মাধ্যমে এটাই নিশ্চিত করে যেন, এই ব্যবস্থার ভেতর থেকে কোনো রাজনৈতিক দলই এই ব্যবস্থার মৌলিক চেতনাকে ধ্বংস করতে পারবে না। যেমন: নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে বাংলাদেশে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তার ফাঁস হওয়া অডিও হতে যার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখব, কিভাবে তিউনিসিয়ার এন-নাহদা, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, আলজেরিয়ার ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট (FIS), তুরস্কের AKP, জর্ডানের IAF, মরক্কোর PJD এর মতো শক্তিশালী আন্দোলনগুলো, জনপ্রিয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। তাদেরকে হয়তো হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, নতুবা তাদের ইসলামী আদর্শ ও রাষ্ট্রগঠনের মূল লক্ষ্য ত্যাগ করে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি অঙ্গ হয়ে থাকতে হয়েছে।

ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা একটি ফরজ ইবাদত। আর প্রত্যেকটি ইবাদতের দুটি দিক রয়েছে; ফিক্বরা (চিন্তা/সমাধান) ও ত্বরীকাহ (কর্মপদ্ধতি)। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) মুসলিমদেরকে শুধু কি করতে হবে তা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং সেই ইবাদত কিভাবে করতে হবে তা হাতে কলমে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। ফলে, যেকোন ইবাদতের ফিক্বরা ও ত্বরীকাহ উভয়কেই কুর‘আন ও সুন্নাহ্‌’র দলীলের ভিত্তিতে নেয়া বাধ্যতামূলক এবং এক্ষেত্রে মানুষের কোন পছন্দ-অপছন্দ, লাভ-ক্ষতি কিংবা বিদ্যমান কোন বাস্তবতার কারণে শরীআহ’র বাইরে যাওয়ার কোন অনুমোদন নেই। যেহেতু শাসনক্ষমতা অর্জন করে ইসলামী শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার সুষ্পষ্ট দলীল রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর নবুয়তের জীবনে জ্বলজ্যান্তভাবে বিদ্যমান, তাই এর বাইরে অন্য যেকোন কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা আল্লাহ্‌’র সুষ্পষ্ট আদেশের পরিপন্থী ও সঙ্গত কারণেই পরিত্যাজ্য। সংসদে সিটের সংখ্যার হিসেবের মধ্যে পরিতৃপ্তি খোঁজা নিশ্চিতভাবেই রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) এর কর্মপদ্ধতির কোন অংশ নয়।

রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর অনুসৃত একমাত্র কর্মপদ্ধতি হল “আহলুল ক্বুউয়্যা ওয়াল মানা’আ” (শক্তিমত্তা ও চূড়ান্ত কর্তৃত্বের অধিকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবর্গের) কাছে নুসরাহ্ অনুসন্ধান ও তাদের কাছ থেকে নুসরাহ্ অর্জনের মাধ্যমে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রয়োগ করা। এই “আহলুল ক্বুউয়্যা ওয়াল মানা’আ’র সাথে বিতন্ডায় জড়িয়ে ও তাদের ব্যাপারে কটুক্তি করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহন করা অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর কর্মপদ্ধতি হল এই “আহলুল ক্বুউয়্যা ওয়াল মানা’আ” এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে ইসলামী শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করা, তাদের ঈমানকে জাগ্রত করা এবং আখিরাতের অবশ্যম্ভাবী পুরষ্কার ও অনিবার্য শাস্তির ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেয়া। এই কাজে সফল হলে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রয়োগ করার strategic, tactical ও operational সমুদয় দায়িত্ব এই “আহলুল ক্বুউয়্যা ওয়াল মানা’আ” এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গ্রহণ করবেন এবং এর বিনিময়ে তাদের পুরষ্কার তারা আল্লাহ্‌’র কাছ থেকে বুঝে নিবেন। কারণ সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি আল্লাহ্‌’র মনোনিত একমাত্র দ্বীন ‘ইসলামের’ জিম্মাদার তারাও। আর তাই, নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ ইসলামপ্রিয় জনগণের উচিত সেকুলারিজমের সাথে কম্প্রোমাইজ (compromise) এর ভুল চিন্তাকে পরিত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দেখানো কর্মপদ্ধতিকে শক্ত করে আকড়ে ধরা এবং প্রাণপন দৌড়ে সেই বিজয়ের ট্রেনে উঠে পরা যে ট্রেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইতিমধ্যেই গন্তব্যের দৃষ্টিসীমায় চলে এসেছে! 

    -    রিসাত আহমেদ


Previous Post Next Post