খবর:
“আমি বিচার চাই না। কারণ, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনারা কোনো এক্সাম্পল দাঁড় করাতে পারবেন? পারবেন না। আমার থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত নেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।” “এটা বড়জোর ১৫ দিন (আলোচনা) চলবে, এরপর ধামাচাপা পড়বে। আমি এটাই দেখে আসতেছি, আমার বয়স ৫৫।” রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে খুন হওয়া আট বছরের শিশু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সামনে এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন। (বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না : রামিসার বাবা | কালের কণ্ঠ)
মন্তব্য:
আসামি গ্রেফতার মানেই বিচার নয়, রায় ঘোষণা মানেও বিচার নয়। বিচার মানে হল অপরাধের জন্য পূর্ব-নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা। রামিসার ৫৫ বছর বয়সী বাবা জানেন যে প্রতিবার এই ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে জনগণ যখন আন্দোলনে নামে তখন আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার করে পরিস্থিতি ঠান্ডা করার চেষ্টা করা হয়। আসামি গ্রেফতারের পরেও জনগণ তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস থেকে যখন আন্দোলন জারি রাখে তখন নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে তড়িঘড়ি করে একটা রায় ঘোষণা করে বলে যে, আমরা বিচার করেছি। কিন্তু এই রায় আপিলের বেড়াজালে বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ঝুলতে থাকে। বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের কাছে এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, একজন ভূক্তভোগী বাবা স্ট্যাম্পে লিখিত দিয়ে চ্যালেঞ্জ করার মত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছে যে বিচার হবে না, অপরাধী তার অপরাধের শাস্তি পাবে না। এটাই “আধুনিক যুগের” সেকুলার শাসনব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে গণমানুষের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গী ও অনুভূতি।
রামিসার ধর্ষক ও খুনি তার দোষ স্বীকার করে জবানবন্দী (confession) দেওয়ার পরেও “আধুনিক যুগের” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী “সংক্ষিপ্ত-সময়ের মধ্যে বিচার করলে অনেক সময় অবিচার হতে পারে” এবং “আসামি পক্ষের আইনি অধিকার আছে, তারা সময় নিবে” বলে বক্তব্য দিয়ে সেকুলার বিচার ব্যবস্থার আসল চেহারা আবারো জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দী দেওয়ার পরও অপরাধীকে দ্রুত শাস্তি দিলে কিভাবে অবিচার হতে পারে! অপরাধ স্বীকার করার পরও আইনি অধিকারের নামে একজন অপরাধী কিভাবে বিচার বিলম্বিত করার জন্য সময়ের আবেদন করতে পারে! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রমাণ করেছেন রামিসার বাবার ধারণা অমূলক নয়, বরং সুপ্রতিষ্ঠিত। রাজনৈতিক দায়মুক্তির জন্য ১ মাসের আল্টিমেটাম দিয়ে এই একটা ঘটনার বিচার যদি হয়ও, তা সত্যেও এই ব্যর্থ সেকুলার শাসন ও বিচারব্যবস্থা অক্ষতই থেকে যাবে এবং লাখো ভূ্ক্তভোগী বিচারের অপেক্ষায় জীবন অতিবাহিত করে ফেলবে।
দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ ধর্ষণের ব্যাপারে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন এবং এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছেন যেন ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ করার সাহস যেন কারো না হয়। কিন্তু, সেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কি হবে তা নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মতামত প্রদান করছেন। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ্ (ﷻ) নির্ধারিত শাস্তির চেয়ে অধিক কার্যকরী ও ফলপ্রসূ শাস্তি আর কি হতে পারে!? রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেন: “(সমাজে) যারা আল্লাহ্’র নির্ধারীত সীমারেখা (হুদুদ) রক্ষা করে ও যারা তা ভঙ্গ করে তাদের উদাহরণ হল যেন তারা উভয় পক্ষই একটি জাহাজের সহযাত্রী। …. নিচের তলার যাত্রীরা যদি জাহাজের তলা ফুটো করে নদীর পানি ব্যবহার করতে যায়, আর উপরের তলার লোকেরা এই কাজে বাঁধা প্রদান না করে তাহলে পুরো জাহাজটি ডুবে যাবে ও সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং যদি উপরের তলার যাত্রীরা বাঁধা প্রদান করে তাহলে জাহাজের সব যাত্রী রক্ষা পাবে।” এই হাদীস অনুসারে কোন একক অপরাধীর উপর আল্লাহ্’র (ﷻ) হুদুদ প্রয়োগ করে শাস্তি প্রদান মূল লক্ষ্য নয়, বরং সমাজ থেকে সেই অপরাধ নির্মূল করা হল মূল উদ্দেশ্য যার মাধ্যমে পুরো সমাজ রক্ষা পাবে। ফলে, পুরো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ্’র (ﷻ) নির্ধারীত সীমারেখা (হুদুদ) প্রয়োগ করা ছাড়া অপরাধ নির্মূল করে পুরো সমাজ ও জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। সুতরাং, যারা সেকুলার বিচার ব্যবস্থার কাছে বিচার দাবী করে আন্দোলন করছেন ও যারা বিচার আশা না করে বিচার নিজের হাতে তুলে নিয়ে ‘হারকিউলিসের’ মত “কিছু একটা করার” চিন্তা করছেন তাদের সকলের উচিত তাদের শক্তি ও সামর্থকে অপচয় না করে মুসলিম উম্মাহ্’র ঢাল ও রক্ষাকবচ খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োগ করা।
- রিসাত আহমেদ
