বাংলাদেশের সাথে জনমুখী সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী ভারত : হাইকমিশনার



খবরঃ

… রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি একথা বলেন।… (https://dailynayadiganta.com/bangladesh/diplomacy/wSCShZGqhCBs#goog_rewarded)

মন্তব্যঃ

একটি দেশের সাথে অন্য একটি দেশের ‘জনমুখী সম্পর্ক’ তৈরি করা এমন একটি ফাঁদ, যা ঐ দেশের সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কোন রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রের সাথে জনমুখী সম্পর্ক তৈরি বলতে বুঝায়, অন্য রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা অংশের সাথে, শিক্ষার বিনিময় কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ইত্যাদি। সেই সাথে মিডিয়ার প্রভাব তৈরি করা, এনজিও কার্যক্রম চালু রাখা, ব্যবসায়ী ও নাগরিক পর্যায়ে যোগাযোগ ইত্যাদিও জনমুখী সম্পর্ক তৈরি করার প্রক্রিয়ার অংশ। এগুলোর মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরিকারী রাষ্ট্রিটি অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তার স্বার্থে বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে এবং সেগুলো অন্য রাষ্ট্রের নীতিসমূহ প্রণয়নে ও বাস্তবায়নে প্রভাব সৃষ্টি করে। 

ভারত আমাদের দেশের সাথে জনমুখী সম্পর্ক তৈরীর নামে এ কাজগুলো অনেক আগে থেকেই করে আসছে। মনিপুরী থিয়েটারের মত সংগঠনের সাথে ভারতীয় দূতাবাস নিয়মিত নৃত্য-সংগীতের আয়োজন করছে। সংস্কৃতি বিনিময়ের নামে বিভিন্ন যৌথ প্রযোজনার সিনেমা তৈরি হচ্ছে, হিন্দি সিনেমা এবং সিরিয়ালগুলো এদেশে জনপ্রিয় করা হচ্ছে, তারপর হিন্দি সিনেমার অনুকরণে বাংলাদেশের সিনেমাগুলো তৈরি করা হচ্ছে। এ সম্পর্কে ভারতীয় রাজনৈতিক ও কলাম লেখক ‘শশী থারু’ তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘বলিউড হল সফ্ট পাওয়ার। এ পাওয়ার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত কামানের গোলা বর্ষণ করে না ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের রূমে যে বাক্সটি (TV) রয়েছে তার ভিতর দিয়ে সংস্কৃতির গোলা বর্ষণ করে। আর সেগুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তছনছ করে দেয়’। দুর্গাপূজা, নজরুল-রবীন্দ্রনাথের নামে উৎসবগুলোতেও ভারতীয় শিল্পীদের এনে যৌথ সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। এদেশের সাংস্কৃতিক কর্মীদেরকে বিশ্বভারতী ও শান্তি নিকেতনের মত প্রতিষ্ঠানগুলো স্কলারশিপ প্রদান করে ভারতীয় ভাবধারার সাংস্কৃতিক কর্মী তৈরি করছে, যারা মূলত এদেশের মিডিয়াগুলোতে ও সাংস্কৃতিক জগতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছে। ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ভাবধারায় এদেশে ‘উদিচি’ কিংবা ‘ছায়ানট’র মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এই সাথে ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা নাগরিক সমাজ- সবার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। (পড়ুন, ভারতের হাইকমিশনের উদ্যোগে ঢাকায় টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা)। এভাবে সর্বক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের সাথে এই তথাকথিত ‘জনমুখী সম্পর্ক’ তৈরির নামে তার প্রভাব তৈরি করছে। এগুলোর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশসহ যেসব রাষ্ট্রে তার আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, সেগুলোতে ভারতীয় জীবনধারা ও ভাবমূর্তি জনপ্রিয় করছে। কারণ জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করলে, রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।

এথেকে বুঝা যায়, সর্বগ্রাসী এ ‘জনমুখী সম্পর্ক’ হচ্ছে ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল মাত্র। শুধু ভারত নয়, চীন তার ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ এর মাধ্যমে কিংবা আমেরিকা তার ‘ফুল ব্রাইট’ প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও এই জনমুখী সম্পর্কের ফাঁদ তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করছে। 

তাই বিভিন্ন পরাশক্তি কিংবা আধিপত্যবাদীদের তৈরি করা এই জনমুখী সম্পর্কের সার্বভৌমত্ব বিনাশী ফাঁদে পতিত হওয়ার রোধে আমাদের একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘যেকোন দল, গোষ্ঠী অথবা সংগঠনের বিদেশে কোন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক থাকা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি কেবলমাত্র রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কারণ উম্মতের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়নের অধিকার শুধুমাত্র রাষ্ট্রের রয়েছে। উম্মাহ্‌ পররাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বিষয়ে শুধু রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতা করতে পারবে।‘ এটা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের কোন ব্যক্তি বা দলের উপর ছেড়ে দিলে সেটি উম্মতের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য নয়, কারণ উম্মতের দেখাশুনার দায়িত্ব তার নয়। এমনকি উম্মত তাকে চিনতেও পারবেনা। যেমন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশে চিহ্নিত নয়। এবং তারা জনগণের নিকট কোন প্রকার জবাব দিতেও বাধ্য নয়। তাই পররাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি একমাত্র শাসকের হাতেই থাকা উচিত। তাহলে পররাষ্ট্র সম্পর্কে শাসককে জবাবদিহিতার অধীনে আনা যাবে। ইসলামে কোন দায়িত্ব জবাবদিহিতামুক্ত নয়। আল্লাহ্‌’র রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “ইমাম (ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক) হচ্ছেন অভিভাবক এবং তিনি তার জনগণের জন্য দায়িত্বশীল”। শাসকের দায়িত্ব শাসক ব্যতীত অন্যকোন ব্যক্তি বা দলের জন্য বৈধ নয়।

    -    মোঃ জহিরুল ইসলাম


Previous Post Next Post