খবর:
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, হাম হঠাৎ করে বজ্রপাতের মতো এসে পড়েছে। আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এতোগুলো শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তিনি মর্মাহত।হস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর শিশু হাসপাতালে গিয়ে তিনি এসব কথা জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ইউনিসেফের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টিকা দিয়ে আগামী রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে।তিনি আরও বলেন, হামের টিকা সংগ্রহ করার প্রস্তুতি চলছে। টিকা হাতে পেতে ১ মাস সময় লাগবে।এ সময় পোর্টারদের বেতন, স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবির বিষয়ে দ্রুততম সময়ে বসে সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি। এদিকে, রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। (https://www.jugantor.com/national/1083937)
মন্তব্য:
হামের প্রাদুর্ভাব জনিত স্বাস্থ্য সংকট কোনো বজ্রপাত কিংবা আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং কয়েক দশক ধরে এদেশের অবহেলিত স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত ব্যর্থতার একটি চেইন রিঅ্যাকশন। দেশের হাসপাতাল গুলোতে পর্যাপ্ত ডাক্তার, ওষুধ, নার্স ও জনবল সংকট, পর্যাপ্ত শয্যা সংকট এবং আইসিইউ , অক্সিজেন-ভেন্টিলেটর সহ জরুরী চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। বাংলাদেশে প্রতি ১০০০ মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছে ০.৮৩ জন! প্রতি ৯৯০ জন রোগীর জন্য ১টি হাসপাতাল শয্যা রয়েছে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪)। আইসিইউ বেডের সংখ্যা জনসংখ্যা প্রতি লাখে মাত্র ০.৭ টি! সারাদেশে আইসিইউ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র ৮-১০ জন! (প্রথম আলো, ৬ এপ্রিল ২০২৬)। অক্সিজেন-ভেন্টিলেটরের অভাবে হাসপাতালগুলোতে স্থানীয় ভাবে তৈরি “হেডবক্স” দিয়ে হাম আক্রান্তদের অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।
দেশের স্বাস্থ্যখাতে এই শোচনীয় বাস্তবতা নিঃসন্দেহে জনগণের প্রয়োজন এবং বিশেষভাবে তাদের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের অবহেলাকে তুলে ধরে। এই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদেরকে এই ব্যবস্থার ভিত্তি অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রতি নজর দিতে হবে। এই মতবাদ অনুযায়ী আল্লাহ্‘কে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, ফলস্বরূপ শাসকের দায়িত্ব হতে পরকালের জবাবদিহিতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শাসকগোষ্ঠীর জন্য তখন নিজের স্বার্থ ও তার মদদদাতা দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই হয়ে পড়ে কাজের অন্যতম অনুপ্রেরণা। তারা জনগণের জন্য শুধুমাত্র ততটুকুই করে যতটুকু না করলে জনগণ বিদ্রোহ করে বসতে পারে।
অন্যদিকে, ইসলাম শাসকের দায়িত্বকে পরকালের জবাবদিহিতার সাথে যু্ক্ত করেছে। তাই, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি কাজের অন্যতম অনুপ্রেরণা হচ্ছে, আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি হতে মুক্তি লাভ। ইসলাম স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্র ও খলীফার প্রত্যক্ষ দায়িত্বে পরিণত করেছে। কারণ স্বাস্থ্যসেবাকে ইসলাম জনগণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক চাহিদা হিসেবে বিবেচনা করে। তাই “ইমাম হলেন অভিভাবক এবং তিনি তার জনগণের উপর দায়িত্বশীল”(বুখারী) এই হাদীস মোতাবেক খিলাফত রাষ্ট্রের খলীফা জাতি, ধর্ম, বর্ণ , ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল জনগণকে বিনামূল্যে উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে বাধ্য যা রাষ্ট্রীয় কোষাগার দ্বারা সম্পুর্ণ অর্থায়িত। কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে হিযবুত তাহ্রীর কর্তৃক প্রণীত খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৬৩ অনুসারে “রাষ্ট্র সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সুবিধা দেবে। তবে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত চিকিৎসা অনুশীলন, চিকিৎসা সেবা গ্রহণ কিংবা ঔষধ বিক্রয় করাকে বাধা দিবে না।” খিলাফত রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যে অগ্রভাবে থাকার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি ও উপায় উদ্ভাবনের জন্য বিপুল সংখ্যক মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলদেরকে একত্রিত করবে এবং তাদেরকে সর্বোচ্চ গবেষণা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে জনগণের সেবার জন্য প্রস্তুত রাখবে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পর্যাপ্ত পরিমাণ হাসপাতাল ও উন্নতমানে চিকিৎসা সরঞ্জামের যোগান নিশ্চিত করবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই অতীতে খিলাফতকে স্বাস্থ্যসেবা ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বিশ্বনেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিল এবং সমগ্র বিশ্ববাসী দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। ৬৮৩ হিজরিতে আল-মালিকুল মনসুর সাইফুদ্দীন কায়রোতে ‘আল-মুস্তাশফল মনসুর আল-কাবির’হাসপাতাল নির্মাণ করেন। শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে এটি ছিল সেই যুগের বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি হাসপাতাল। এর চিকিৎসা সেবাও সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছিল। প্রত্যেক রোগীর সেবার জন্য দুজন করে ব্যক্তি নিযুক্ত ছিল। এর বিশেষত্ব ছিল এই যে, শুধুমাত্র হাসপাতালে অবস্থানকারীদেরই চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো না; বরং, যেসব রোগী হাসপাতালে আসতে অক্ষম ছিলেন, তাদের বাড়িতে গিয়ে সেবা দেওয়া হতো এবং প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র ও খাবার সরবরাহ করা হতো। এই হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। সেবা গ্রহণের পর যারা সুস্থ হয়ে উঠতেন, তাদের যাওয়ার সময় পরার জন্য এক সেট নতুন পোশাক দেওয়া হতো এবং বাড়ি ফিরে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে যাতে তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও দেওয়া হতো (মিন রাওয়াইয়ি হাযারাতিনা, পৃষ্ঠা ২১২)।
- কাজী তাহসিন রশীদ
