যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাল বাংলাদেশ, স্থায়ী শান্তির জন্য সংলাপের আহ্বান



খবর:

মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিরতির এই উদ্যোগকে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনের দিকে একটি উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে দেশটি সকল পক্ষকে স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। (https://www.jugantor.com/national/1086636 )


মন্তব্য:

“স্বাধীনতা” এবং “সার্বভৌমত্ব” এই শব্দদুটো ব্যবহার করে দীর্ঘকাল প্রতারণা চলে আসছে। বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোকে স্বাধীন এবং সার্বভৌম বলে একটা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোর কথা এবং কাজ উভয়ের মধ্যেই প্রচন্ড রকমের নতজানুতা পরিলক্ষিত হয়। এই নতজানু পররাষ্ট্র নীতিকে “ব্যাম্বু ডিপ্লোমেসি” (বাঁশের মতো বাতাসের সাথে নুয়ে পড়া কিন্তু না ভাঙা) বা Finlandization (ফিনল্যান্ড তার শক্তিশালী প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্ষুব্ধ না করার জন্য নিজের পররাষ্ট্রনীতি এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে ক্রেমলিনের কোনো ক্ষতি না হয়) বলা হয়। বর্তমান সময়ে চলতে থাকা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও ভয়াবহ রকম “ব্যাম্বু ডিপ্লোমেসি”তে আক্রান্ত। যেমন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের তৈরি করা সকল তথাকথিত “আন্তর্জাতিক” আইন-কানুন ভঙ্গ করে ইরানে আক্রমণ চালায় এবং তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে খুন করে, তখন বাংলাদেশের ধর্মভীরু মুসলিমরা তীব্রভাবে এর নিন্দা জানালেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বপ্রকাশ্য খুনী আমেরিকা এবং খুন হওয়া ধর্মীয় নেতার নাম পর্যন্ত উল্লেখ না করে বরং উল্টো ইরানের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌমত্ব ভঙ্গের জন্য নিন্দা জানায় (মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ইরানের হামলায় নিন্দা বাংলাদেশের-২ মার্চ, ২০২৬-দৈনিক সমকাল)। এতে করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি আসলে কতটুকু “স্বাধীন ও সার্বভৌম” তা সহজেই অনুমেয়। এই একই ধারা আমরা ১৯৯০ এ ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে আমেরিকার গুড বুকে থাকার জন্য কুয়েতের সার্বভৌমত্ব ভঙ্গের জন্য ইরাকের প্রতি বাংলাদেশকে নিন্দা জানাতে দেখি। ২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর ততকালীন বিএনপি পররাষ্ট্র মন্ত্রী War on Terror এর মত ইসলামবিদ্বেষী প্রজেক্টে আমেরিকার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক সহায়তা প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়। এছাড়াও ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে হাসিনা সরকার আমেরিকার চাপে “ইন্দো প্যাসিফিক আউটলুক” প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়” কিংবা “লুক ওয়েস্ট” নীতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে খুব সহজেই বোঝা যায় যে “স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব” এই শব্দগুলো বরাবরই অলংকারিক এবং প্রতারণাময়।

মূলতঃ ওয়েস্টফ্যালিয়া নীতির উপর ভিত্তি করে “স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব” শব্দগুলোকে “দুধভাত” (বড়দের খেলায় যে শিশুদের গুরুত্ব দেয়া হয় না) হিসেবে খাইয়ে নির্দিষ্ট ভূখন্ড, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, নির্দিষ্ট পলিসি ইত্যাদি শর্ত চাপিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোকে আমেরিকার মত ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো নতজানু করে রাখে। তারা বোঝাতে চায় যে আমরা উপনিবেশবাদ থেকে বের হয়ে প্রত্যেক রাষ্ট্রকে তার সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছি। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হল বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোর সম্পদের একচ্ছত্র মালিকানা তো পলিসিগতভাবে উপনিবেশবাদিদেরই, এমনকি মুখের কথাটুকুও তাদের ইচ্ছার সাথে ‘মেটিকুলাসলি’ সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

ইসলামি শাসনামল অর্থাৎ খিলাফতের সময়ে আমরা কোন প্রতারণা দেখতে পাই না। সে সময় বর্তমান ৫৭টি রাষ্ট্র এক হয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়েও খিলাফত শাসনামলে কোন অঞ্চলকে দুর্বল করে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার কোন নজির দেখতে পাওয়া যায় না। বরং রাজধানীর চেয়েও উন্নত হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চল এরকম অসংখ্য নজির রয়েছে। যখন বাগদাদ ছিল আব্বাসীয়দের রাজধানী, তখন স্পেনের কর্ডোবা শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে এতটাই উন্নত হয়েছিল যে একে বলা হতো "পৃথিবীর রত্ন" (Ornament of the World)। রাজধানীর চেয়ে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ইমাম বুখারি বা ইবনে সিনার মতো জ্ঞানতাপসরা সেখানে তৈরি হয়েছিলেন। এখানকার লাইব্রেরি ও মানমন্দিরগুলো (Observatory) অনেক সময় কেন্দ্রীয় রাজধানীর চেয়েও বেশি সমৃদ্ধ ছিল। ওমর বিন আব্দুল আজিজের সময়ে রাষ্ট্রের স্বচ্ছলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো অঞ্চলে যাকাত নেওয়ার মতো একজন অভাবী মানুষও খুঁজে পাওয়া যেত না। এতে করে সহজেই বোঝা যায়, সেই অঞ্চলগুলোর গভর্নরদের সাথে খলিফার ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদি ব্যবস্থার মত “লুট করা” এবং “লুট হওয়া”র মত কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক ছিল না। কারণ খিলাফতের উদ্দেশ্য সম্পদ কুক্ষিগত করা নয়, বরং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র সন্তুষ্টির জন্য শাসনকার্য পরিচালনা করা। এতে করে খলিফা এবং তার গভর্নরদের আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ছাড়া আর কারো প্রতি নতজানু হওয়ার প্রয়োজন হত না। কারণ তারা জানতেন, “কর্তৃত্ব (সার্বভৌমত্ব) শুধু আল্লাহ্‌’র” [সূরা ইউসুফঃ ৪০]।

    - জাবির জোহান

Previous Post Next Post