ইরানের উপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই আকস্মিক বিমান হামলা বিশ্বজুড়ে স্তম্ভিত অবস্থার সৃষ্টি করেছে, যা বিশ্বজুড়ে একইসঙ্গে নিন্দা এবং স্তব্ধ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এই যুদ্ধের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সতর্ক ও মাপজোক করা শব্দে সাজানো। বাংলাদেশ ইরানি পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিষয়ে কোনো নিন্দা জানায়নি। মূল ভুক্তভোগী হিসেবে ইরানের কোনো উল্লেখ সেখানে ছিল না। এটি কেবল বাংলাদেশের সুপরিচিত অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেই নয়, বরং আমাদের পররাষ্ট্রনীতির এক গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। এই যুদ্ধ সেই দুর্বলতা তৈরি করেনি; বরং তা কেবল প্রকাশ করে দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ থেকে যদি কোনো শিক্ষা নেওয়ার থাকে, তবে তা হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। (https://dailyinqilab.com/national/news/884976)
মন্তব্য:
মুসলিম ভূখন্ডের উপর উপনিবেশবাদীগোষ্ঠীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোন সরকার কেন কুটনৈতিকভাবে কিংবা সামরিকভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের পক্ষে অবস্থান নেয় না, তার কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক অনুসৃত কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। বর্তমান আধুনিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি ১৬৪৮ সালে জার্মান শহর ওয়েস্টফালিয়ায় স্বাক্ষরিত ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি। ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি পরবর্তী জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোকে কেন্দ্র করে উপনিবেশবাদীগোষ্ঠী বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে পরাশক্তি (Leading State), স্যাটেলাইট স্টেট (Satellite State) ও অধীনস্ত রাষ্ট্রের (Subordinate State) মত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ভাগ করেছে। স্যাটেলাইট রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কোন না কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সংযুক্ত থাকে, যেমন আমেরিকার সাথে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইরান ও তুরস্কের সম্পর্ক। আর, অধীনস্থ রাষ্ট্রসমূহের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতি উভয়ই কোন না কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়। যেমনঃ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মিশরের সাথে বৃটেন কিংবা আমেরিকার সম্পর্ক। সুতরাং, ইরান ও তুরস্কের মত স্যাটেলাইট রাষ্ট্র (Satellite State) কিংবা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মত অধীনস্থ রাষ্ট্রগুলোর (Subordinate State) পররাষ্ট্রনীতি সর্বদাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের মত উপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রভাব বলয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থায় এই পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে শাসকদের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলনের কোন সুযোগ নেই, বরং তারা তাদের নিয়োগ করা কর্মচারীর মত। তাদের সমস্ত বক্তব্য-বিবৃতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। অধীনস্থ রাষ্ট্রগুলো (Subordinate State) নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ক্ষতি সত্ত্বেও উপনিবেশিক শক্তিকে স্বার্থ রক্ষা করে, যেমনটি আমরা মার্কিনীদের সাথে করা দেশবিরোধী বানিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করলাম। এই অধীনস্ততার জন্যই বাংলাদেশ সহ মুসলিম বিশ্বের কোন রাষ্ট্র গত ৩ বছর ধরে আমেরিকা ও দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে গিয়ে আল আকসা ও ফিলিস্তিনের মুসলিমদের সাহায্যার্থে কিছু করেনি। মিয়ানমারের মত একটা ভঙ্গুর রাষ্ট্র কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের কোন রাষ্ট্রই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। এই অধীনতার কারণেই কাশ্মীরকে ভারতের অভ্যন্তরীন ইস্যু হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। একই কারণে, মার্কিনীদের স্বার্থরক্ষামূলক পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে, বর্তমানে ইরানের পক্ষে অবস্থান নেয়নি।
সুতরাং, “সবার সাথে বন্ধুত্ব - কারো সাথে শত্রুতা নয়”- নামক তথাকথিত যে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে, তা মূলত “মার্কিনীদের সাথে বন্ধুত্ব - মার্কিনীদের শত্রুদের সাথে শত্রুতা”। অথচ মুসলিমদের রয়েছে ইসলাম প্রদত্ত বিকল্প রাজনৈতিক আদর্শ ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি- যা আকড়ে ধরার মাধ্যমে মুসলিমরা সহজেই পশ্চিমাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে, বিশ্বের নেতৃত্বশীল জাতি হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম। ইসলামের রাজনীতির মূলমন্ত্র হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে মুসলিম উম্মাহ্’র দেখভাল করা এবং ইসলামের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী জীবনাদর্শকে দাওয়াহ্ ও জি*হা-দের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দেয়া।
ইসলামী জীবনাদর্শ বাস্তবায়নকারী-খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিমরা তাদের বিপুল জনশক্তি, কৌশলগত অবস্থান, সামরিক শক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। তখন তারা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যবর্তী মালাক্কা প্রণালী থেকে শুরু করে মিশরের সুয়েজ খাল পর্যন্ত সমস্ত জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের বিষয়াবলীতে আধিপত্য বিস্তারকারী একমাত্র শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয়ে উঠবে। ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা স্যাটেলাইট রাষ্ট্র(Satellite State) এবং অধীনস্থ রাষ্ট্রের(Subordinate State) পরিবর্তে পরাশক্তির আসনে নিজেদেরকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে মুসলিম ভুখন্ডসহ বিশ্ব পরিমন্ডল থেকে কাফির উপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন ও আধিপত্যকে স্থায়ীভাবে নির্মূল করতে সক্ষম হবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহ্‘কে সাহায্য করো, তবে তিনিও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে দৃঢ়পদে প্রতিষ্ঠিত করবেন” [সূরা মুহাম্মদ: ৭]
- কাজী তাহসিন রশীদ
