খবর:
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে একটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর দুই সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।… (https://www.bbc.com/bengali/articles/cx2ez3lz8xyo)
মন্তব্য:
ক্ষমতালোভী সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গুলো। কারণ এ
খানে বিরাট সংখ্যক তরুণ একত্রিত থাকে। তাই এখানে যে দল হল দখল করবে, তারা ক্যাম্পাসগুলোতে কর্তৃত্ব করবে। যারা ক্যাম্পাসে কর্তৃত্ব করে, তারা ছাত্রদের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে নিজেদের দল ভারী করে। আর ক্যাম্পাসে যাদের দল ভারী হয়, তারা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব সৃষ্টি করে। অবশেষে ছাত্র-রাজনীতি হয়ে যায় একটি ‘পাওয়ার গেম’। তখন মেধাবী ও রাজনৈতিক সচেতন ছাত্ররা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়।
এই সুযোগে এখানে জায়গা করে নেয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলীয় সন্ত্রাসীরা। প্রায়ই এই ‘পাওয়ার গেম’ রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে, যা এ দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজ তথা জনগণকে চরমভাবে আতঙ্কিত করে তোলে। এই আতঙ্ক আবার ছাত্ররাজনীতিবিরোধী সুবিধাবাদী চক্রগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করে। তখন দেশের স্বার্থে সচেতন রাজনৈতিক শক্তিগুলো কোনঠাসা পড়ে। সাধারণ ছাত্রদের রাজনীতির প্রতি ঘৃণা ও দূরত্ব বাড়তে থাকে। আর তখন জাতি এক মহাবিপর্যয়ে নিপতিত হয়। কারণ শাসকরা এই সুযোগে বিনা প্রতিরোধে তাদের অন্যায় নীতিগুলো চালিয়ে দেয়। তখন বিদেশীদের সাথে ACSA, GSOMIA এর মতো চুক্তির ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন করে না যে, এই চুক্তি কার সাথে স্বার্থে হচ্ছে? আই.এম.এফ, বিশ্ব ব্যাংকের মতো উপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের শর্ত সমূহকে চ্যালেঞ্জ করার মতও কেউ থাকেনা।
এটা উপনিবেশিক ব্রিটিশ কর্তৃক প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থারই একটি ধারাবাহিকতা, যেখানে একদিকে থমাস ম্যাকলে শিক্ষানীতি অনুসরণ করে ব্রিটিশ শাসনের সহায়ক গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছিল, অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গসহ বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্রদের দমন করা হয়েছিল। সেই উপনিবেশিকতার ধারাবাহিকতায় আজকে নব্য উপনিবেশিকতার যুগেও একদিকে মুখস্ত-ভিত্তিক, চাকরি কেন্দ্রিক ও সমাজ-রাজনীতি বিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে, যা সচেতন নাগরিক না বানিয়ে জনগণকে কামলা হিসেবে তৈরি করছে। এখানে ‘ভালো জিপিএ মানে ভালো জীবন’ এই তত্ত্বকথা প্রতিষ্ঠা করে প্রবল চাপ দিয়ে এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যেন তারা সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে ভাবার সুযোগও না পায়। এখানে ‘রাজনীতি মানেই খারাপ’ এই ন্যারেটিভ অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেন যেকোনো সচেতন মানুষ এটা থেকে যথেষ্ট দূরে থাকে। সেই সাথে এটাও প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, জীবন মানে টাকা কামাও, ভোগ করো। যার কারণে মানুষ সামাজিক দায়িত্ব পালন বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজস্ব ভোগবাদী কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। এক কথায় উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠীকে বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে তাদের মন, চিন্তা ও জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
এই ছাত্র বিরাজনীতিকরণের ফাঁদ থেকে আমাদেরকে বের হতে হলে, এমন একটি সঠিক গাইডলাইন দরকার, যা একদিকে ছাত্রদের দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ থেকে বের করে ঐক্যবদ্ধ করবে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছাত্র সমাজ তৈরি করবে। এক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শের গাইডলাইনই হতে পারে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একমাত্র সঠিক ও বাস্তবসম্মত গাইডলাইন। কারণ ইসলামে রাজনীতি মানে হল, জনগণের দেখাশোনা করা, সেটা শাসক হিসেবে হোক কিংবা শাসিত হিসেবে হোক, যা প্রত্যেকটি মুসলিমের জন্য ফরজ দায়িত্ব। শাসক জনগণকে অভিভাবকের ন্যায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার হুকুম অনুযায়ী দেখাশোনা করবে, আর জনগণ সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ফরজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শাসকদেরকে জবাবদিহিতা করবে। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক কিংবা ইমাম হাম্বল প্রত্যেকেই এই কাজে শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এই যুগের শাসকদেরকে জবাবদিহিতা করতে হবে এবং ইসলামের আদেশ পালনের ব্যাপারে আহ্বান করতে হবে। তাদেরকে উপনিবেশবাদী শক্তির সাথে করা বিভিন্ন চুক্তির ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে, সেটা সামরিক, অর্থনৈতিক, ভুরাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা বাণিজ্যিক-যাই হোক না কেন। তাহলেই ছাত্ররাজনীতি দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে বের হয়ে জনগণের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
- মোঃ জহিরুল ইসলাম
