মার্চে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছে সরকার: পিআরআই



খবর:

রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকার নতুন করে টাকা ছাপানো শুরু করেছে। শুধু মার্চ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটা হাইপাওয়ার মানি, ছাপানো টাকা। অর্থাৎ এটার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। (মার্চে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছে সরকার : পিআরআই | দৈনিক নয়া দিগন্ত)


মন্তব্য:

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়, যখনই সরকারের টাকার প্রয়োজন হয় তখন তারা চাইলেই টাকা ছাপাতে পারে। কিন্তু, ছাপানো এসব কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে সোনা বা রুপার মতো কোনো মূল্যবান ধাতুর সরাসরি মজুত থাকে না। সরকার যখন তার ব্যয় মেটানোর জন্য বা বাজারে তারল্য বাড়াতে সরাসরি নোট ছাপানোর নির্দেশ দেয়, তখন এর বড় ঝুঁকি হলো মুদ্রাস্ফীতি। পণ্যের উৎপাদন না বাড়িয়ে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ানো হয়, ফলে জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হতে থাকে।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় মানুষের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হওয়ায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি করে, পরিণতি দাঁড়ায় যে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। ১৯২৩ সালে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য জার্মানির কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না, বাধ্য হয়ে জার্মানি নিজস্ব মুদ্রা “মার্ক” ছাপাতে শুরু করে, পরিণতিতে তাদের মুদ্রার মান এতটাই কমে যায় যে, এক টুকরো রুটি কিনতেও এক ঝুড়ি টাকা নিয়ে যেতে হতো। বর্তমান ভেনিজুয়েলা সমাজতান্ত্রিক ধারার হলেও তাদের অর্থনীতি বিশ্বের পুঁজিবাদী বাজারের সাথে যুক্ত। তেলের দাম কমে যাওয়ায় দেশটির আয়ও কমে যায়, ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে তারা অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানো শুরু করে, পরবর্তীতে দেখা যায় যে সেখানে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে।

এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় Trickle Down Theory মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুন্ঠন করে কতিপয় পুঁজিপতিকে যাবতীয় সম্পদের সুবিধাভোগী করে তোলা হয়। তাই আমরা দেখি যে সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ তাদের ক্ষমতার মাধ্যমে ব্যাংক খালি করে ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যে ঋণ নেয় তা অনুৎপাদনশীল খাতে (যেমন: আমলাদের বেতন বা বিলাসি প্রকল্পে) ব্যয় করা হয়, এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে এর সুফল জনগণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। এই ব্যবস্থায় ঋণের সুদ থাকে যা রাষ্ট্রকে পরিশোধ করতে হয়। এছাড়াও, ইচ্ছামত টাকা ছাপিয়ে ঋণখেলাপীদেরকে বেইল আউট করে তাদেরকে সমৃদ্ধ ও মোটাতাজা করা হয়। সুতরাং এই ব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠী, তার সহযোগী এবং কতিপয় পুঁজিপতির স্বার্থ রক্ষার জন্য টাকা ছাপায়, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্ষতি বাড়ায়। 

ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় মুদ্রা হল স্বর্ণ ও রৌপ্য ভিত্তিক, অন্য কোন ধরনের মুদ্রাও প্রস্তুত করতে পারে, তবে শর্ত হল সমপরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকতে হবে। অর্থাৎ চাইলেই যেকোন সময় রাষ্ট্র মুদ্রা ছাপাতে পারে না। তাই মৌলিকভাবে এই মুদ্রা ব্যবস্থা স্থিতিশীল। উসমানি খিলাফতের একটি সুদীর্ঘ সময় (৮০ বছরের অধিক) মূল্যস্ফীতি ঘটেছে মাত্র ৭%। এছাড়া শারীয়াহ্ সম্পদকে কিছু লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকাকে নিষিদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রের শারীয়াহ্ নির্দেশিত বিভিন্ন খাত (খারাজ, উশর, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ ইত্যাদি) রয়েছে যেখান থেকে তার আয় আসতে থাকবে। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়নের ফলে জনগণ সত্যিকারের ঐশ্বর্যমণ্ডিত জীবন অতিবাহিত করতে সক্ষম হবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “আর যদি সে সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম….” [আল-আ'রাফ : ৯৬]

    -    কাজী মুনতাসির

Previous Post Next Post