জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও কমেনি সংকট, পাম্পে দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তি



খবর:

ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও সংকট কাটেনি। বরং রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন, বাড়ছে ভোগান্তি। রোববার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক চালক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। কোথাও কোথাও লাইনের শেষ আশপাশের অলিগলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।  এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, দাম বাড়লেও তেলের সরবরাহ বাড়েনি। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি পাননি তিনি। এক মোটরসাইকেল চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে, অথচ তেলের নিশ্চয়তা নেই। পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, পাম্পে তেল এলেই দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর আগে শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যা রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। (https://dailyinqilab.com/motropolis/news/885300)

খবর:

দেশ আজ যে  জ্বালানী সংকটের মুখোমুখি, সেটা শুধু কোনো দূর দেশের যুদ্ধের “পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া” নয়। বরং, দেশের গভীর দুর্বলতা ধরা পড়ে। কারণ, এই সংকটটা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আমরা বহু বছর ধরে এমন একটা energy model বানিয়েছি যেখানে দেশীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমদানি নির্ভর জ্বালানিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ১০৯টির বেশি LNG cargo আমদানি করেছে, যার পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই import-based policy রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। এই নির্ভরতার একটা লজ্জাজনক উদাহরণও আমরা দেখেছি। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেল ও অন্যান্য petroleum product কিনতে বিশেষ ছাড়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দিয়েছে। অর্থাৎ, নিজের জ্বালানি কোথা থেকে কিনবে, সেটাও অন্য দেশের অনুমতির উপর নির্ভর করছে! এই ঘটনা শুধু energy crisis-এর না, বরং policy sovereignty-এর সংকটেরও প্রমাণ।

২০২৪-২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়। সরকারি ও বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে এই কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল তৈরি করা হয়, যা দেশের পুরো চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অকটেনের চাহিদার একটি বড় অংশ, প্রায় ৬০% দেশেই উৎপাদিত হয়, বাকি প্রায় ৪০% সরাসরি পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ডিজেল বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন জ্বালানি (মোট চাহিদার প্রায় ৭৫%), কিন্তু এর দেশীয় উৎপাদন খুবই নগণ্য। উপাত্ত থেকে এটা পরিষ্কার যে, স্বল্পমেয়াদী কয়েকটা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে জ্বালানী খাতের সমস্যা অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব হবে। বর্তমান কূপগুলো থেকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন গ্যাসকূপ খনন করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে ভোলার কথা নিয়ে আসা যায়, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালেও ভোলার ইলিশা-১ সহ বিভিন্ন কূপে সফলভাবে ড্রিলিং শেষ হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাপেক্স (BAPEX) ধারাবাহিকভাবে সেখানে নতুন নতুন কূপ খনন করছে যাতে উত্তোলনের সক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়। নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে আসা 'কনডেনসেট’ পরিশোধন করে দেশে অকটেনের চাহিদার প্রায় পুরোটাই মেটানো সম্ভব হবে। আমরা দেখেছি যে, প্রেট্রোল পাম্পের বাইরের সবচেয়ে বড় লাইন হল মোটর বাইকের। এর সিংহভাগই রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের সাথে যুক্ত, অর্থাৎ তাদের কর্মসংস্থানের সমস্যা। তারা এর চেয়ে বেটার কোন কর্মসংস্থান পেলে এই পেশায় থাকবে না। এছাড়াও, মানসম্পন্ন গণপরিবহনের অভাবে অনেকেই মোটর বাইক বা গাড়ি কিনতে বাধ্য হয়েছে, যদিও এগুলো গণপরিবহনের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল। তাই মানসম্পন্ন গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হলে মোটর বাইক বা গাড়ি ব্যবহারের পরিমান কমে যাবে এবং অকটেন সাশ্রয় হবে। আর প্রাইভেট কার বা গাড়ি সিএনজিতে কনভার্ট করার জন্য সরকার প্রনোদনা দিতে পারে, তাহলে জ্বালানীর জন্য হাহাকার কমে যাবে। কারণ গ্যাস আমাদের নিজস্ব, বাইরের উপর নির্ভরশীল নয়। 

আমরা জানি যে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের জন্য মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে, যেগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) বা তারও বেশি গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রের এই মজুদ দেশের আগামী কয়েক দশকের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এছাড়াও গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে তেলের বিশাল ভাণ্ডার থাকার ধারণা করা হচ্ছে। এই খনিজ তেল পরিশোধন করে পেট্রোল, অক্টেন ও ডিজেল পাওয়া যাবে, ফলে ডিজেলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ভারী শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রূপপুরের মত আরো পারমাণবিক প্রকল্প হাতে নিতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপরে চাপ কমে যায়। পরমাণু প্রকল্পগুলোর জন্য কক্সবাজার সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামের মজুদ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা পরবর্তীতে এনরিচমেন্টের মাধ্যমে পরমানু অস্ত্র বানানোর কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বহুগুনে বৃদ্ধি পাবে। 

সবশেষে, এসব নীতির বাস্তবায়ন কেবলমাত্র ইসলামী ব্যবস্থার অধীনে সম্ভব- যে ব্যবস্থায় জ্বালানি হচ্ছে গণমালিকানাধীন সম্পদ। তাই আমাদের দেশের সকল গ্যাসক্ষেত্র ও সমুদ্রের হাইড্রোকার্বন ব্লকসমূহ শেভরন, কনোকো ফিলিপস, এক্সনমোবিল-এর মতো বিদেশী কোম্পানিসমূহের নিয়ন্ত্রণ ও প্রাইভেটাইজেশন থেকে মুক্ত করা হবে। ফলে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ এগুলো Profit Earning Commodity হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, বরং দেশের জনগণ এগুলো বিনামূল্যে পাবে। এছাড়াও, মুসলিম ভূখন্ডগুলো খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে একীভূত হয়ে গেলে জ্বালানি সমস্যা থাকবে না, কারণ তখন মধ্যপ্রাচ্যের তেল পশ্চিমা শক্তিসমূহের দালাল শাসকদের নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং সকল মুসলিমদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।

- রবিউল ইসলাম

Previous Post Next Post