নববর্ষ বরণে ইসলামি সাংস্কৃতিক জোটগুলোর ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন

 


খবর:

কোরআন শরিফের রেহাল, তাসবিহ, রক্তভেজা শাপলাফুলসহ নানা শিল্পকর্ম নিয়ে পহেলা বৈশাখে ভিন্ন ধরনের শোভাযাত্রা করেছে জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। নানা আয়োজন দিনটি উদযাপন করছে অন্য ইসলামি সাংস্কৃতিক জোটগুলোও। সোমবার (১৪ এপ্রিল) সকালে কোরআন শরিফের রেহাল, তাসবিহ, পর্দায় জড়ানো রিকশা আর শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের স্মরণে রক্তেভেজা শাপলাসহ নানা শিল্পকর্ম নিয়ে রাজধানীতে শোভাযাত্রা করে জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ইসলামি সংগীত পরিবেশনায় র‌্যালিতে ছিল, কৃষকের লাঙ্গল, মাথাল, হালখাতার সামগ্রীও। তারা বলছেন, বিগত সরকার বিজাতীয় সংস্কৃতি বাঙালি মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। তাই মুসলিম বাঙালির হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে তাদের এই শোভাযাত্রা। (https://www.somoynews.tv/news/2025-04-14/VWPPwBWN)

মন্তব্য:

বাংলা নববর্ষের মত উৎসব উদযাপন কিংবা পশ্চিমা সংস্কৃতির ব্যাপারে বিভিন্ন মুসলিমদের মধ্যে স্পষ্টতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাছাড়া, এগুলোকে ইসলামের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ করে তোলার অপচেষ্টাও বহু পুরোনো। ফসলের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ১৫৮৪ সালে শুরু হওয়া বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ১৯৮৯ সালে প্রবর্তিত 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'-র সঙ্গে যুক্ত করে এটাকে সার্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে আসছে। দেশের ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা বাংলা নববর্ষের ব্যাপারে যে Grand Narrative প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে সেটা হচ্ছে “নববর্ষ সাংস্কৃতিক উৎসব, ধর্মীয় নয়। আমরা আগে বাঙ্গালি, পরে অন্য পরিচয়”। ফলস্বরূপ, মুসলিম সংস্কৃতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে নববর্ষ উদযাপনের কারণে মুসলিমদের মধ্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

মুলত: ইউরোপে রেঁনেসার পর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (ধর্মকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্নকরণ মতবাদ)  স্রষ্টার প্রেরিত জীবনবিধানের বদলে মানব যুক্তি ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু, এই মতবাদ সংস্কৃতি, ফ্যাশন, লাইফস্টাইল গ্রহণের ব্যাপারে সমাজের সবাইকে একই ছাতার নিচে আনতে পারেনি। বরং, সমাজের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাপারে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন (Perspectives) উদ্ভব হয়েছে। তাই, বিভিন্ন দৃষ্টিকোনকে সমাজে সহাবস্থান করাতে পশ্চিমা সমাজে বহুত্ববাদ (Pluralism) নামক চিন্তার উদ্ভব ঘটে, যে চিন্তার ঢেউ আমাদের মুসলিম সমাজেও লেগেছে। এটি কোন একটি একক সত্য বা পরিচয়কে একমাত্র সঠিক বলে মেনে নেয় না এবং সবকিছুকে Fuild/Socially Constructed বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। এটি সকল ধর্ম ও মতের মানুষের বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে বহুত্ববাদের (Pluralism) প্রকাশ হিসেবে গণ্য করে। এই হাইব্রিড (Hybrid) দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মুসলিম সম্প্রদায় বা ইসলামী সাংস্কৃতিক জোটগুলো বাংলা নববর্ষকে ইসলামী সংস্কৃতির অংশ হিসেবে মহিমান্বিত করছে, বিভিন্ন ইসলামী উপায় ও উপকরণের ব্যবহার এবং ইসলামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে উৎসাহিত হচ্ছে। 

সুতরাং, মর্ডানিজম, পোস্ট-মর্ডানিজম কিংবা মেটা-মর্ডানিজম যে নামেই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আসুক না কেন তা বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে সমাজকে বিভ্রান্ত করেছে এবং কোন কিছুরই সত্য সমাধান দিতে পারেনি। অথচ, বাস্তবে সত্যের (Truth) অস্তিত্ব রয়েছে। সব মতবাদ সঠিক, সব সংস্কৃতি সঠিক- এটা কোন যুক্তি হতে পারেনা। একটা বাস্তবতাকে (Reality) পুর্ববর্তী তথ্যের (Previous information) সাথে সংযুক্ত করে ইন্দ্রিয়ের(Sensation) মাধ্যমে মস্তিষ্কে(Brain) স্থানান্তরের মাধ্যমে কোন কিছুর অস্তিত্ব বা সত্যতা প্রমাণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি উড়োজাহাজ উড়ে গেলে সেটা না দেখেও শুধুমাত্র তার শব্দ শুনে উড়োজাহাজটির অস্তিত্বের ব্যাপারে চূড়ান্ত সত্যে (Absolute Truth) উপনীত হওয়া যায়। সুতরাং, সত্য অবশ্যই Exist করে। সত্য ও মিথ্যার সঠিক মানদন্ড আসতে পারে কেবলমাত্র মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহ্‘র কাছ থেকে, কারণ তিনি হচ্ছেন সেই সত্তা যিনি সকল সীমাবদ্ধতা, আপেক্ষিকতা ও পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, বলেন “যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই কি জানেন না” (সুরা মুলকঃ১৪) । স্রষ্টা প্রদত্ত ইসলামী শারীআহ্‌ আমাদের বিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব, পোশাক, সংস্কৃতি, ফ্যাশন, লাইফস্টাইল ও উৎসব সহ মানবজীবনের সকল বিষয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও মানদন্ড প্রদান করে। যেকোনো উৎসবই কোনো না কোনো ‘দ্বীন বা ‘বিশ্বাস থেকে উৎসারিত হয়। বাংলা নববর্ষ হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং স্রষ্টাবিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে এটিকে  উৎসবে পরিণত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন, “প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ (উৎসব) আছে, আর এটা আমাদের ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা)” [বুখারী ও মুসলিম] । সুতরাং, একটা বিশেষ সংস্কৃতি ও উৎসব গ্রহণীয় নাকি বর্জনীয় এ ব্যাপারে ইসলাম মুসলিমদেরকে ১৪০০ বছর আগেই সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। তাই মুসলিমদের উচিত এই লেন্স দিয়েই যেকোন উৎসব সহ জীবনের প্রতিটি বিষয়কে মূল্যায়ন করা।

- কাজী তাহসিন রশীদ

Previous Post Next Post