মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে অশনি সংকেত

 


খবর:

আমরা জানি আমাদের ওষুধশিল্পের সঙ্গে মেধাস্বত্ব আইনের একটা জটিল সম্পর্ক আছে। দেশে উৎপাদিত ৯০ শতাংশ ‘জেনেরিক’ ওষুধের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে (বেশির ভাগেরই পেটেন্ট নেই)। এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের (ইনগ্রেডিয়েন্ট) মধ্যে কোনটির আইপি লাইসেন্স আছে, কোনটির নেই, কোনটির ‘পেটেন্ট’ লঙ্ঘিত হয়েছে, কোনটির হয়নি, এটা কীভাবে নির্ণয় করা সম্ভব? কে করবে, কীভাবে করবে? এটা কার কাজ? এটা আর যাই হোক কোনোভাবেই বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কাস্টমসের কাজ নয়। তা হলে এই কাজটি করবে কে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চমকে উঠতে হয়। কাঁচামাল বা পণ্য আমদানিতে বিদেশি কোম্পানির ‘আইপি রাইট’ লঙ্ঘিত হলে বাংলাদেশের কাস্টমস যেন সেটা ‘পাকড়াও’ করতে পারে, এই উদ্দেশ্যে অনেক দিন আগে থেকেই বন্দর কাস্টমসের সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। [https://www.prothomalo.com/opinion/column/89b6b5m4rh]


মন্তব্য:

২০২৬ সালের ২৪শে নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি অর্থাৎ Least Developed Country এর তালিকা থেকে বের হয়ে ডিসি অর্থাৎ Developing Country এর তালিকায় প্রবেশ করবে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের নির্ধারণ করা কিছু সূচকে উতরে গিয়ে বাংলাদেশ Developing Country এর তালিকায় প্রবেশ করবে।  স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা একটা ইতিবাচক খবর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোন সচেতন ব্যক্তিই যিনি বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা রাখে এই খবরে খুশি হতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশ মূলতঃ একটি প্রবল সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও একটা ভয়াবহ রকমের পরনির্ভরশীলতার চক্রে আবদ্ধ রাষ্ট্র। আমরা এলডিসি হিসেবে রেডিম্যান্ট গার্মেন্টস শুল্কমুক্তভাবে বিদেশে বিক্রি করতে পারি এবং এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়। আমরা কৃষিতে ভর্তুকি দিতে পারি কারণ এলডিসি হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা তা করতে দেয়। পশ্চিমাদের কাছ থেকে সফটওয়্যার কিনতেও যে ছাড় পাওয়া যায় ডিসি (ডেভেলপিং কান্ট্রি) হলে তা আর পাওয়া যাবে না। কারণ আমাদের নিজস্ব সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি নাই। আমাদের ওষুধ শিল্প যাকে মনে করা হয় খুবই স্বনির্ভর শিল্প, এটাও মূলতঃ একটা ভয়াবহ পরনির্ভরশীল শিল্প। কারণ জেনেরিক ওষুধ-এর রেসিপিও পশ্চিমাদের ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানিদের থেকে ধার করা। এলডিসি হওয়ার কারণে আমাদেরকে রয়ালটি ফি দিতে হয় না। ডি.সি হয়ে গেলেই দিতে হবে। এতে ওষুধের দাম অনেক বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক ওষুধ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই, বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে আর্জি জানিয়েছে তাকে যেন ডি.সি হওয়া সত্ত্বেও ওষুধের ক্ষেত্রে তাকে ২০৩২ পর্যন্ত এলডিসির সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়।

এই যখন বাংলাদেশের করুণ অবস্থা, তখন সে অসহায় দৃষ্টিতে জাতিসংঘ আর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে ভিক্ষা চাচ্ছে যেন আরো কিছুদিন সে “অনুন্নত” তালিকায় থাকতে পারে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাথে করা বাণিজ্য চুক্তিতে এখন থেকেই বাংলাদেশের উপর সে সকল সুযোগ সুবিধা উঠিয়ে নিয়েছে। তাই এখানে উল্লেখ্য কলামের লেখিকার মত কতিপয় সুশীলরা এই নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি থেকে বের হয়ে জাতিসংঘ আর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আরো অনেকদিন এলডিসির সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা!

যেকোন পরামর্শ বা চিন্তা কোন একটা ভিত্তি থেকে আসে। বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোর চিন্তাবিদরা মূলতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বানানো বিশ্বব্যবস্থার নব্য-উপনিবেশবাদি কাঠামোকে কুর্নিশ করেই যাবতীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কারণ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি যেমন মার্কিনীদের, তেমনি জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাও মার্কিনীদের। তাই,  এদের মধ্যে যে কোন একটাকে বেছে নেয়া হল মূলতঃ “এক কোপে কল্লা ফেলিয়ে মরতে চাই” নাকি “একটু একটু বিষ খেয়ে মরতে চাই” এই দুই অপশনের মধ্যে যেকোন একটাকে বেছে নেয়ার শামিল। বরং, তাদের পরামর্শ হওয়া উচিৎ ছিল যে, কিভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিনীদের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বনির্ভর হতে পারবে সেই দিকনির্দেশনা দেয়া।

সত্যিই যদি বাংলাদেশ এরকম অপমানজনক অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে চায়, তবে আমাদেরকে অবশ্যই সকল শিল্পে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেমনঃ ওষুধ শিল্পে অন্যের রেসিপি ফলো না করে নিজস্ব গবেষণা চালিয়ে ওষুধ তৈরি করা শুরু করতে হবে। Active Pharmaceutical Ingredient (API) উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা মাত্র ১০ শতাংশ। ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। কিভাবে এই উৎপাদন বাড়ানো যায় সেই নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা থাকতে হবে। জ্বালানি, ভারী যন্ত্রপাতি, সামরিক শিল্প ইত্যাদি শিল্পে পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া পরনির্ভরশীলতা নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ ওগুলো ওষুধসহ সব রকমের শিল্পের অপরিহার্য উপাদান।

কিন্তু মার্কিন বিশ্বব্যবস্থায় নিজের সদস্যপদ নিশ্চিত করে মার্কিনীদের স্বার্থে আঘাত করে কোন পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। কারণ বাংলাদেশের মত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর স্বনির্ভর হওয়ার অভিলাষই মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী। তাই মুসলিমদের একটা নিজস্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা আমাদেরকে স্বনির্ভর করবে এবং একই সাথে বিশ্ববাসীকে মার্কিন অন্যায় আধিপত্যবাদের হাত থেকে রক্ষা করবে। আসন্ন খিলাফত ব্যবস্থাই মানুষকে সেই মুক্তির স্বাদ দিতে সক্ষম। কারণ ইতিহাস বলে মুসলিমরা কখনো কোন আবিষ্কার, পলিসি ইত্যাদি দিয়ে অন্য রাষ্ট্র বা অঞ্চলকে পঙ্গু করে রাখে নাই। বরং জ্ঞান যা আল্লাহ্‌’র পক্ষ থেকে প্রদত্ত, তা কুক্ষিগত রাখা ইসলামে হারাম। মুসলিমরা যেখানেই আল্লাহ্‌’র বাণী পৌঁছে দিয়েছিল, সে অঞ্চলই স্বনির্ভর হয়ে উঠেছিল, কারণ তারা সৃষ্টিকে স্রষ্টার নিয়মেই পরিচালনা করত। উদ্দেশ্য থাকত আল্লাহ্‌’র সন্তুষ্টি। 

    -    জাবির জোহান

Previous Post Next Post