খবর:
সাগরে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস ও পরিবহন করতে আট হাজার কোটি টাকার বেশি খরচে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ব্যবহার উপযোগী হলেও দীর্ঘদিন ফেলে রেখেছে বাংলাদেশ। কাজে আসছে না মজুত সক্ষমতাও।
(https://www.bbc.com/bengali/articles/c74vx9kxw4no )
মন্তব্য:
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব যখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই দেখা গেল-শুধুমাত্র বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগ করতে না পারার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা অব্যবহৃত পড়ে আছে। বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠী কেন এরকম গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা অব্যবহৃত রেখেছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে দেখা যায়, প্রমাণিত ও প্রাক্কলিত রিজার্ভের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই (৩–৬ মাসে) বর্তমান প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি (এলএনজি, কয়লা, তেল) প্রায় ৯০% কমিয়ে আনা সম্ভব। মধ্য ও স্বল্পমেয়াদে দেশ ব্যাপক পরিমাণে জ্বালানি রপ্তানিও করতে পারবে। বণিক বার্তার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি খনিতে প্রায় ৭,৮২৩ মিলিয়ন টনের বেশি উচ্চমানের বিটুমিনাস কয়লার মজুদ রয়েছে। অনতিবিলম্বে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ি ও জামালগঞ্জ খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে নিজস্ব কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব; পাশাপাশি কয়লা রপ্তানি থেকেও বিপুল রাজস্ব অর্জন করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিজার্ভের মাত্র ৫০% উত্তোলনযোগ্য ধরা হলেও ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দৈনিক ২০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
অন্যদিকে, শেভরন মাত্র ৩–৪টি বড় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৬৩% সরবরাহ করছে, যেখানে তিনটি দেশীয় কোম্পানি প্রায় ২০টি ক্ষেত্র পরিচালনা করেও মাত্র ৩৭% উৎপাদন করতে পারছে। দেশীয় ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত উন্নত ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপন এবং ‘ওয়ার্কওভার’ (মেরামত) কার্যক্রম চালালে তাৎক্ষণিকভাবে ১৫–২০% উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় কোম্পানিগুলোতে এক বছরের এলএনজি আমদানির সমপরিমাণ (৫–৬ বিলিয়ন ডলার) সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা গেলে তাদের সক্ষমতা শুধু শেভরনের সমতুল্য নয়, বরং বিশ্বের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর কাছাকাছি উন্নীত করা সম্ভব। দেশীয় কোম্পানীর সক্ষমতা বাড়িয়ে শেভরনের মত বিদেশী কোম্পানীগুলোর হাতে থাকা ফিল্ডগুলো নিজেরা পরিচালনা করলে, Production Sharing Contract এর নামে আমরা আমাদের যে গ্যাস তাদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক দামে ডলারে কিনছি তা সাশ্রয় করতে পারি। বর্তমান হিসাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাস মজুদ ৮.৫–৯.৫ টিসিএফ বলা হলেও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জরিপ (যেমন: USGS, নরওয়েজীয় প্রতিষ্ঠান NPD এবং গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটস) অনুযায়ী প্রাক্কলিত মজুদ ৩৪ থেকে ১০০ টিসিএফ-এর মধ্যে। এই প্রাক্কলনের অন্তত অর্ধেক উত্তোলনযোগ্য হলে বাংলাদেশ আগামী ৪০–৫০ বছর কোনো আমদানি ছাড়াই নিজস্ব গ্যাসে চলতে পারবে। এই গ্যাস ব্যবহার করে শুধু বিদ্যুৎ নয়, সার উৎপাদনসহ শিল্পকারখানাও চালানো যাবে। এভাবে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে গ্যাস উৎপাদন তিনগুণ করা গেলে গ্যাসের সঙ্গে উৎপাদিত কনডেনসেটও অন্তত দ্বিগুণ হবে। এই কনডেনসেট পরিশোধন করে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলসহ জ্বালানি তেলের আমদানি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কনডেনসেট থেকেই বিভিন্ন তেলের চাহিদার ৩০–৫০% চাহিদা পূরণ হচ্ছে।
এই বিশাল সক্ষমতা কাজে লাগাতে না পারার মূল কারণ হচ্ছে নেতৃত্বের ‘মানসিকতা’ এবং ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা’। পুঁজিবাদী মানসিকতা (যেমন "রাষ্ট্র উৎপাদন করবে না, করবে বেসরকারি খাত”) জ্বালানি খাতকে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে দিয়েছে। পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (যেমন: UN, World Bank, IMF, WTO) একটি কাঠামো দ্বারা তৈরি ও সুরক্ষিত। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামী একটি বিকল্প পথ নির্দেশ করে। প্রথমত, ইসলামে শাসক জ্বালানিসহ এরকম ‘গণমালিকানাধীন সম্পদে’র মালিক নয়, বরং দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধায়ক। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, “ইমাম/খলিফা তার জনগণের বিষয়ে দায়িত্বশীল…”। দ্বিতীয়ত, ইসলামী রাজনৈতিক সত্তা তথা খিলাফত পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। বনু শায়বান বিন সালাবাহ যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে ক্ষমতা দেয়ার শর্ত হিসেবে পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাদের চলমান চুক্তি বজায় রাখতে চেয়েছিল, তখন তিনি (সা.) সেই সহায়তা গ্রহণ করেননি, বরং বলেন, “তোমরা সত্য ও স্পষ্টভাবে জবাব দিয়েছ; তবে আল্লাহ্’র দ্বীনকে তারাই সাহায্য করতে পারে, যারা একে সবদিক থেকে বেষ্টন করে রাখে।”
- মোহাম্মদ তালহা হোসেন
