খবর:
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদে দুই–তৃতীয়াংশ আসনে মেজরিটি (সংখ্যাগরিষ্ঠতা) হলো অভিশাপ। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই অভিশাপ একাধিকবার এসেছিল। তাই নতুন করে সেই অভিশাপে যেন আবার পড়তে না হয়, সে জন্য অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ‘কার্স অব টু-থার্ড মেজরিটি’-র (দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিশাপ) উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৩, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরেন বদিউল আলম মজুমদার। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/9u88bwcm98 )
মন্তব্য:
গণতন্ত্র হল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন। এই শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল যে দল সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয় তারা সরকার গঠন করে; যেখানে ৫১% আসন কিংবা ৯১% আসন কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। ৫১% আসন হলে সেটা গণতন্ত্র, আবার ৯১% আসন হলেও সেটা গণতন্ত্রই থাকে। অর্থাৎ, সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা-কে অভিশাপ হিসেবে অভিহিত করে জনাব বদিউল আলম মজুমদার যে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন তার প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায়: ‘গণতান্ত্রীক শাসনব্যবস্থা হল বাংলাদেশের জনগণের জন্য অভিশাপ’। এই বিষয়টি তিনি তিনটি গণতান্ত্রীক সরকারের (১৯৭৩, ২০০১ ও ২০০৮) শাসন-আমলের যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তা প্রমাণ করেছেন। সেই গণতান্ত্রীক সরকারগুলোকে অভিশাপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি যথার্থ কাজ করেছেন এবং জনগণও তার এই বক্তব্যের সাথে একমত।
বাস্তবতা হল: সেই তিনটি সরকার ছাড়াও যে বাকি সরকারগুলো এসেছে তারাও একই ধরনের দু:শাসন উপহার দিয়েছিল, যা নিয়ে সচেতন নাগরিকদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে, এরপরেও কেন জনাব বদিউল আলমের মত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে এই অভিশাপরূপী শাসনব্যবস্থাকে নিত্যনতুন উপায়ে, নানান তালবাহানায় টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে আসছেন এবং এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছেন? তারা কি জনগণের কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তা করছেন? নাকি এর পিছনে তাদের বিদেশী প্রভূদের আশির্বাদ ও স্বার্থ জড়িত?
গণতন্ত্র নিয়ে যেকোন আলোচনার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল “নির্বাচনী ব্যবস্থা ও শাসক নিয়োগ করা” মানেই গণতন্ত্র নয়। সংসদ সদস্যদের মূল উপাধী হল “আইন প্রণেতা” (law-maker)। ভোটের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের হাতে আইন প্রণয়নের সর্বময় ক্ষমতা ন্যাস্ত করাই হল গণতন্ত্র। এটা সারাবিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত। জনাব বদিউল আলম যে বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে অভিশাপ বলেছেন তার মূলে রয়েছে সংসদের হাতে ন্যাস্ত করা এই আইন প্রণয়নের সর্বময় ক্ষমতা। উনার ভাষ্যমতে, দুই-তৃতিয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারী দল সংবিধান ও রাষ্ট্রের ভিত্তির সাথে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পরিবর্তন করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয় এবং যেকোন আইন পাশ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে পারে; যা রাষ্ট্রের ও জনগণের জন্য বিপদজনক। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হল: এই দুই-তৃতিয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই বিপদজনক বিধান কিভাবে সংবিধানের মধ্যে ঢুকে পড়লো? আর এই বিধান যদি জনগণের জন্য অভিশাপ ও বিপদজনকই হয় তাহলে সেটা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আবার এই সংবিধানই অনুসরণ করতে হবে কেন? Does it make any sense? এই গোলকধাঁধা কার স্বার্থে তৈরী করা? আর যাই হোক জনগণ এখন জানে যে এই সংবিধানই হল জনগণের সকল সমস্যার মূল।
মূলত চিন্তাশীল, দূরদর্শী ও অন্তঃর্দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিরা হল মুসলিম উম্মাহ্’র সম্পদ ও পথপ্রদর্শক। যারা উম্মাহ্’র বিপদে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং উম্মাহ্‘কে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে অতিদ্রুত সেই বিপদ থেকে বের করে আনেন। বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজ কখনোই এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি, বরং দেশের ব্যর্থ সংবিধান ও পরিত্যাজ্য শাসনব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরী করে তারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ফলশ্রুতিতে, জনগণের কাছে ‘সুশীলতা’ এখন একটি ঘৃণ্য গালিতে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের ব্যক্তিরা যদি তাদের সম্মান পুনরুদ্ধার করে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যান লাভ করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত ইসলাম ও পবিত্র কুরআন নিয়ে অধ্যয়ন করা এবং ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ভিত্তিতে জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের দিকে অগ্রসর হওয়া। মহা-ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: “তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীরভাবে অনুসন্ধান ও চিন্তা-ভাবনা (তাদাব্বুর) করে দেখে না? নাকি তাদের অন্তরগুলো তালাবদ্ধ হয়ে আছে (যে হিদায়াত সেখানে প্রবেশ করতে পারে না)?” (সূরা মুহাম্মদ: ২৪)
- রিসাত আহমেদ
