খবর:
ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প নতুন শ্রমবাজারের সন্ধানে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বুধবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। এ সময় তিনি বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশ মোতাবেক প্রয়োজন অনুসারে দেশভিত্তিক স্থানীয় লবিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ করাসহ সরকারের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেমন সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল, রাশিয়া ইত্যাদি নতুন দেশগুলোয় বিকল্প শ্রমবাজার সম্পসারণে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কর্মী নিয়োগকারী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের সফরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের জন্য কাজ চলছে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশে প্রয়োজন অনুসারে দেশভিত্তিক স্থানীয় লবিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/g3bwub432x)
মন্তব্য:
অস্বাভাবিক অভিবাসন ব্যয়, স্বল্প দক্ষতার শ্রমিক প্রেরণ, এবং দালালদের দৌরাত্ম্যসহ নানাবিধ কাঠামোগত সংকটে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার জর্জরিত। দালালের প্রতারণার শিকার, নিয়োগকর্তা কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসা একটি নিয়মিত ঘটনা। প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমবাজারের কাঠামোগত সংকটগুলো দূর না করে সরকারের এই উদ্যোগগুলো আদৌ কোন ফল দেবে?
শ্রমবাজার সম্প্রসারণ মূলত তিনটি চলকের উপর নির্ভরশীল। প্রথমত, অভিবাসন শ্রমিক নিয়োগকারী দেশে শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা। দ্বিতীয়ত, অভিবাসন গ্রহণকারী দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিক সরবরাহের সক্ষমতা, এবং তৃতীয়ত, সাশ্রয় ও দক্ষ অভিবাসন প্রক্রিয়া। শ্রমবাজারের এই কাঠামোগত জায়গায় কাজ না করে, কেবলমাত্র লবিস্ট নিয়োগ বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসী প্রেরণ শুধু ব্যর্থই হয় না, বরং শ্রমিকদের জীবনও বিপদসংকুল হয়ে উঠে। কারণ, লবিস্টরা তাদের সাফল্য দেখানোর জন্য প্রকৃত চাহিদা না থাকার পরেও শ্রমিক পঠানোর সুযোগ খোঁজে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত ক্ষমতায়ন করা হয়। এই ক্ষমতায়নের ফলে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এক ধরনের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব তৈরি হয়। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ মালয়েশিয়ায় চাকরি: ৭৯ হাজার টাকার খরচ বেড়ে পাঁচ লাখ, ডি ডাব্লিউ.কম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)। যার ফলে, অভিবাসী শ্রমিকরা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রকৃত চাহিদা বিবেচনা না করে দ্বিপাক্ষিক চু্ক্তির মাধ্যমে সিন্ডিকেটেড প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া অভিবাসন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। মালয়েশিয়ার মানবাধিকার সংস্থা তেনাগানিতার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়া গমন করেছে। এদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন, বেতন পাননি। এদের মধ্যে অনেকে মালয়েশিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নিয়োগের জন্য ২৫ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে। এজন্য তাদের ঋণ করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা বেকার, বেতনহীন ও গৃহহীন এবং প্রতিনিয়ত গ্রেফতারের ঝুঁকিতে পড়েছেন। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ বিদেশি কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি সংস্কারের আহ্বান মানবাধিকার গোষ্ঠীর, সময় নিউজ, ১৮ মে ২০২৫)। এছাড়াও, বর্তমান অভিবাসন মডেলেটিতে শ্রমিকরা স্ত্রীসহ পরিবারের বাকী সদস্যদের দেশে রেখে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশে বসবাস করে, যার ফলে অভিবাসী ব্যক্তি তার পরিবারের পরকীয়াসহ নানাবিধ সংকট ঘণীভূত হচ্ছে। এই সংকটগুলোর কারণে অভিবাসী ব্যাক্তি বা তার পরিবারের সদস্যদের আত্নহত্যার মত ঘটনা ঘটছে। (বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ পারিবারিক কলহ: মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীর ‘আত্মহত্যা’, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এপ্রিল ২, ২০২৬)।
নিরাপদ শ্রমবাজারে জন্য প্রয়োজন উচ্চ চাহিদার দেশ অনুসন্ধান, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা তৈরির প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় স্তরে চুক্তি, এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা। এই ক্ষেত্রে উসমানীয় খিলাফতের অভিবাসন মডেলটি একটি অনুকরণীয় মডেল হতে পারে। উসমানীয় খিলাফতের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে কৃষি, ব্যবসায়, বাণিজ্যে, এবং শিল্প ক্ষেত্র প্রচুর অভিবাসীর প্রয়োজন হয়েছিল। অভিবাসীরা সেখানে পরিবারসহ বসবাস করত এবং ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে স্থানীয় নাগরিকদের মত মর্যাদা এবং সম্মান উপভোগ করতো।
- মো: সিরাজুল ইসলাম
